রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সংসদের ‘তার কেলেঙ্কারি’ কারা এই গণপূর্তের প্রকৌশলীরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
এপ্রিল ৪, ২০২৬ ১১:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হয় যে সংসদে তা নিয়েই এখন চলছে নানা সমালোচনা। কারণ হিসেবে সংসদ সদস্যরা অভিযোগ তুলেছেন সাউন্ড সিস্টেম স্পিকারের মান নিয়ে। তারা জানিয়েছেন নিম্ন মানের সাউন্ড সিস্টেমের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে নানা সমস্যার কথা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর যে অধিদপ্তর কাজটি করে থাকে সেটি হচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তা নিয়ে এখন উঠেছে অনিয়মের নানা গুঞ্জন।

অভিযুক্তদের নিয়ে আলোচনা : নিম্ন মানের কাজ করে ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিপুল অংকের টাকা।

তা ছাড়া জানা গেছে, দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নানা সুবিধা নিয়েছেন বিভিন্ন প্রকৌশলী। এর মধ্যে অন্যতম বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী। তারা গড়েছেন নামে-বেনামে গাড়ি বাড়ি। পাচার করেছেন বিদেশের মাটিতে বিপুল অংকের টাকা।

আলোচিত সমালোচিত সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমের বিষয়টি কেন্দ্র করে সামনের সারিতে মুখোশ উন্মোচন হয় গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশরাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ, উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামসুল ইসলামের মত ব্যক্তিদের নাম।

জানা গেছে, সংসদে কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সাউন্ড সিস্টেম হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়ায় সংসদের কার্যক্রম সামরিকভাবে থমকে যায়। একইসঙ্গে সংসদ সদস্যদের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের নিম্নমান নিয়ে ওঠে তীব্র সমালোচনা। এ ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় সংসদের মতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যযের দায় কার?

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাশেম (ব্যারিস্টার আরমান)।

তিনি অভিযোগ করেছেন, নিম্নমানের এই হেডফোন ব্যবহার করতে গিয়ে তার কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি, অধিবেশনের শেষ দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এ সমালোচনা করেন তিনি।

পোস্টে কালো রঙের একটি হেডফোনের ছবি শেয়ার করে মীর আহমদ বিন কাশেম লেখেন, সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই খারাপ যে তা ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা ধরেছে। সাউন্ড কোয়ালিটিও অত্যন্ত নিম্নমানের বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার দাবি, সংসদের পুরোনো ডিভাইসগুলোও সম্ভবত এর চেয়ে পরিষ্কার অডিও দিত। তিনি আরও লিখেছেন, পুরো বিষয়টি তাকে হতাশ করেছে। পুরনো ডিভাইসগুলোতে সম্ভবত এর চেয়ে পরিষ্কার অডিও দিত। তার এমন পোস্ট দ্রুতই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।

সংসদের মূল সাউন্ড: জানা যায়, ঘটনা সূত্রপাত হয় অধিবেশন চলাকালেই। নতুন স্পিকার মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য শুরু করতে গেলে সংসদের মূল সাউন্ড সিস্টেমের হঠাৎ করেই যান্ত্রিক ত্রুটি রাখা দেয়। মাইকে কথা বললেও তার ঠিকভাবে শোনা যাচ্ছেনা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকার কে শেষ পর্যন্ত হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে বক্তব্য দিতে হয়। এ সময় তিনি অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। পরে বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাাট অব্যাহত ছিল। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার লজ্জাজনক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

সংস্থাটির সূত্র বলছে– নতুন এই সাউন্ড সিস্টেমের কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। সংসদের মতো প্রযুক্তির নির্ভর প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ১০ -১২ দিনের নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পরে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা -তা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে। সাউন্ড সিস্টেমের সরবরাহ করেছেন আমানত এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দুলাল। ঘটনার পর তার ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।

সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণার দায়িত্বে রয়েছেন ৫ প্রকৌশলী হলেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশরাফুল হক , তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শামসুল ইসলাম। অভিযোগ উঠেছে কাজ না পুরাতন যন্ত্রাংশ হেডফোন রিপেয়ারিং করে তারা চালিয়ে দেয় । আর বিপুল অংকের টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে বিল নিয়ে যায় পাঁচ প্রকৌশলী।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, সংসদের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেমে মানসম্পন্ন কেবল ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের তার ব্যবহার হয়েছে। নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন উপেক্ষা করে বিভিন্ন অংশে নিম্নমানের কেবল ব্যবহার এবং সংযোগে জোড়া লাগানোর মতো অনিয়ম করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার জানিয়েছেন এ প্রতিবেদককে, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) ব্যবহার করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে।

তারা জানান, একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়ার মাধ্যমে একটি ‘বিশেষ বলয়’ তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এ ধরনের অনিয়ম হলে সাধারণ প্রকল্পের চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। এ অবস্থায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি। তাছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার এই কাজে কতটুকু দুর্নীতি হয়েছে। যারা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হবেন তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার ব্যবস্থা করা।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে পাঁচ প্রকৌশলী সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে কাউকে পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত চলছে অভিযোগ প্রমানিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওযা হবে।