প্রচ্ছদ

ব্যাংকিং সেক্টর কার: সায়েন্স, আর্টস নাকি কমার্সের

২১ মে ২০১৮, ০৯:২৪

যুগের কন্ঠ ২৪ ডট কম
যুগেরকন্ঠ ডেস্ক:

বর্তমানে বিভিন্ন গ্রুপে ব্যাংকের বর্তমান পরীক্ষাগুলোতে সায়েন্স থেকে পাশ করাদের বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে অভিযোগ করে অনেকে হা-হুতাশ করা করছেন। পাশাপাশি কেউ কেউ সায়েন্স থেকে পাশ করাদেরকে কটুক্তি করছেন। তাদের প্রতি আমার কিছু কথা:

১.

পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নাই যে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর শুধু কমার্স থেকে পাশ করার জন্যই নির্দিষ্ট! এমন না যে সেখানে সায়েন্স বা আর্টস থেকে পাশ করলে ব্যাংকে আবেদন করার যোগ্যতা থাকে না।

২.

ব্যাংকের পরীক্ষায় সবার নজর শুধু ম্যাথের দিকে। প্রিলিতে ১০০ নম্বারের মধ্যে ২৫ নাম্বার ম্যাথ, আর রিটেনে ২০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নাম্বার ম্যাথ। এই মোট ৩০% এর মত ম্যাথ আসে। বাকি ৭০% নাম্বার তো বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান থেকে আসে। যারা বাংলা পড়েছে, তারা বাংলাতে সুবিধা পায়, যারা ইংরেজি পড়েছে, তারা ইংরেজিতে সুবিধা পায়। বাংলা ও ইংরেজিতে প্রিলি রিটেন মিলে ৫৫-৬০% আসে। তাহলে সবার নজর এত সায়েন্সের দিকে কেন! সবচেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা তো আর্টস থেকে যারা পাশ করে তারা পাচ্ছে। ব্যাংকের পরীক্ষায় Synonym, antonym যে আসে বা যখন কঠিন কঠিন ট্রান্সলেশন দিয়ে দেয়, তখন তো কমার্সের কেউ তো এটা বলে না, যে যারা ইংরেজি থেকে পড়ছে তাদের বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

৩.

আমি এখন পযন্ত ব্যাংকের পরীক্ষায় একটাও পিউর সায়েন্সের ম্যাথ আসতে দেখি নাই। ব্যাংক পরীক্ষার ম্যাথে যতগুলো টপিকস আছে কোনোটাই সায়েন্সের ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্রি বা উচ্চতর গণিত থেকে আসতে দেখি নাই। যদিও বা কিছু বীজগণিত আসে, কিন্তু সেগুলো ক্লাস এইট নাইনের সাধারণ গণিতের বই থেকে। সাধারণ গণিত তো সবার সাবজেক্ট ছিল। সবারই পারা উচিত ছিল। যেমন আমরা বাংলা ইংরেজি কিছুটা পারি, কারণ বাংলা ইংরেজি সবার সাবজেক্টই ছিল। সেরকম আপনাদেরও পারা উচিত ছিল। এখন যদি ক্লাস এইটের নাইনের ম্যাথ না পেরে সায়েন্সের দোষ দেন, সেটা আসলে  ‘নাচতে না জানলে উঠান বাকা’ এই টাইপের।

সায়েন্সের স্টুডেন্টদের সিলেবাসের কিছুই আসে না। যদি জানতে চান, যারা এসএসসি, এইচএসসিতে সায়েন্স নেয় বা ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বা ম্যাথে অনার্স করে তাদের বইগুলো খুলে দেখেন। ওইগুলা পরে ব্যাংকের পরীক্ষার জন্য কোনো লাভ হয় না। আমার অনেক ফ্রেন্ড আছে যারা ম্যাথে বা ক্যামিস্ট্রিতে পরে এখনো পযন্ত ব্যাংকের প্রিলিই টিকতে পারে নাই। কমার্সের যেসব স্টুডেন্টরা সারাজীবন ব্যাবসায় শিক্ষা পড়ে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে পারে না, তারাই সায়েন্সের দিকে আঙুল তোলে।

৪.

ব্যাংকের পরীক্ষায় যে ম্যাথ গুলো আসে, সেগুলোর বেশির ভাগই আমি IBA, GMAT এর পরীক্ষায় আসতে দেখি। IBA এর BBA বা MBA এর Admission Test এ বা GMAT এ আমার ধারণা অনুসারে এইগুলা কমার্সের এর সাথেই সম্পর্কিত। এখন আপনাদের যুক্তি অনুসারে IBA Department তাদের BBA বা MBA course গুলো সায়েন্সের স্টুডেন্টদের জন্য খোলা রাখছে।

 

ভাই আসেন আমরা নিজেদের দোষ অন্যদের ঘাড়ে চাপানো থেকে বিরত থাকি। আপনারা পারেন না, এটা আপনাদের ব্যার্থতা। একটা যুক্তি দেখিয়েছেন, “প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে ম্যাথের উত্তর দেওয়ার সুবিধা বিজ্ঞানের ছাত্ররাই বেশি পারবে।” ভাই, যেকোনো পরীক্ষায় নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে নিদিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই হল আসল পরীক্ষা। এখানে সায়েন্স, আর্টস আর কমার্স না্ই। সায়েন্সের স্টুডেন্টরা তো অন্যগুলো এত ভাল পারে না! অনেক উদাহরণ এমন আছে অংক তিন চারটা ভুল করার পর বাকিগুলোতে ভাল লিখে চাকুরি পেয়েছে। আবার এমন বহু উদাহরণ আছে, সবগুলো ম্যাথ পারার পরেও চাকুরি হয় নাই। ব্যাংকের পরীক্ষায় শুধু ম্যাথই যাচাই করে না। আরো কিছু যাচাই করে। আর এখানের ম্যাথগুলো আসলে আপনাদের ব্রেনের পরিধি যাচাই করে। আমরা বাংলাদেশে দেখি যে একটু ভাল স্টুডেন্ট সেই সায়েন্স নেয়, আর অপেক্ষাকৃত কম ভালগুলো কমার্স বা আর্টস নেয়। ভালরা আজীবনই ভাল থাকে। যারা ভাল স্টুডেন্ট, কিন্তু কমার্স বা আর্টস এ পরে তারাও ম্যাথে ভাল করে। It’s all about mental ability and strength.

এখানে এমন না যে সায়েন্স থেকে পড়েছে দেখে, তাকে সুবিধা বেশি দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদের বৈষম্য করা হচ্ছে। ব্যাংকের পরীক্ষায় সবার জন্য লেবেল প্লেইং ফিল্ড দেওয়া হচ্ছে। যদি ম্যাথের কারণে যুক্তি দেখার সায়েন্সের স্টুডেন্টরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে, তাহলে আমি বলব সায়েন্সের চেয়ে যারা বাংলা ও ইংরেজিতে পড়েছে, তারা টেকনিক্যালি বেশি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।

 

অনেকে বলেন, সায়েন্স থেকে পড়ে ব্যাংকে আসেন কেন! আমিও তাহলে বলতে পারি, যারা যারা আর্টস থেকে পড়েছে, তাদের তো তাহলে এই দেশে শিক্ষকতা ছাড়া আর কোনো চাকুরি নাই। তাহলে কমার্সের স্টুডেন্টরা আর্টসের দিকে আঙুল তোলেন না কেন! আর যারা কমার্স থেকে পড়েন, তারা কেন বিসিএস দিয়ে আর্টস থেকে পাস করাদের ক্ষতি করছেন? আপনাদের যুক্তিতে তো বিসিএসের বেশির ভাগ ক্যাডার আর্টস গ্র্যাজুয়েটদের পাওয়ার কথা!

 

বাংলাদেশে যে পরিমাণ স্টুডেন্ট সায়েন্স বা সায়েন্স রিলেটেড সাবজেক্ট পড়ে, সেই পরিমাণ জব সেক্টর নাই। পদার্থ, রসায়ন বা জীববিজ্ঞান থেকে পড়লে শিক্ষকতা ও গবেষণা ছাড়া তেমন কোনো জব সেক্টর খোলা নাই। এই ব্যবস্থা কি সরকার করতে পারছে? যদি নাই পারে তাহলে এত কোর্স চালু রাখছে কেন? কেন এত স্টুডেন্টদের এই সাবজেক্টগুলোতে অনার্স করায়? তাহলে বৈষম্যের স্বীকার বেশি হচ্ছে কারা? ১০ বছর সায়েন্স পড়ার পর কেন আমাদের অন্যদিকে মুভ করা লাগে? আমাদেরও নতুন করে চাকুরির পড়া পড়তে অনেক কষ্ট লাগে। অন্যদের চেয়ে বেশি কষ্ট হয়। সায়েন্স থেকে পড়ে কেউ শখ করে ব্যাংকে আসে না। একেবারে বাধ্য হয়ে বাঁচার জন্য ব্যাংকিং বা অন্য সেক্টরে জব করতে আসে। বাংলাদেশে বাস করে কখনো শিক্ষা জীবনের সাথে কর্মজীবন মেলালে হবে না। প্রফেশনাল লাইফে কে তার প্রফেশনে কত বেশি আন্তরিক সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা চাকুরিদাতারাও বুঝে। সায়েন্স এর স্টুডেন্টদের মেধা এবং ক্রেডিবিলিটির কারণেই যুগ যুগ ধরে ব্যাংকে তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ১৯৭৮ সালে সকল ব্যাংকে নিয়োগের জন্য ব্যাংক রিক্রুটমেন্ট নামে একটি কমিটি ছিল। সেই কমিটির প্রধান যিনি ছিলেন (তার নাম মনে করতে পারছি না) তিনি একবার টক শো তে বলেছেন, ব্যাংকিং সেক্টর পৃথিবীর অন্য সব সেক্টর থেকে আলাদা। যে যতই অনার্সে কমার্স পড়ুক, ব্যাংকিং সেক্টরে একেকজন কর্মীকে তৈরি করে নিতে হয়। সেখানে সাবজেক্ট গুরুত্বপূর্ণ না। তাই দেখা যায়, ব্যাংকিং সেক্টরে উপরের প্রতিটি পদে এক একজন ব্যাংক একেবারে নিচ থেকে চাকুরি পেয়ে প্রমোশন পেয়ে উপরে উঠেছে। অন্যান্য মন্ত্রনালয় বা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, উপরের পদগুলোতে বিভিন্ন বিভাগ থেকে ট্রান্সফার করে নিয়ে আশা হয়। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে যেকোনো পদে অবশ্যই তাকে প্রথমে ব্যাংকার হতে হবে। তাই ব্যাংকের আবেদনের জন্য কোনো প্রকারের সাবজেক্টের বাধ্যবাধকতা থাকে না।

Shares