এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে খুলনার মাদক ব্যাবসায়ী ও গডফাদাররা

মঙ্গলবার, ২৯ মে, ২০১৮ ৫:২৭:০৯ অপরাহ্ণ
0
152

খুলনা প্রতিনিধিঃ খুলনায় মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের গডফাদাররা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশেষ করে সহযোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তালিকা দীর্ঘ হলেও ব্যবসায়ী এবং মাদকের পৃষ্ঠপোষকদের ধরতে প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা নেই।এ তালিকায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রয়েছেন রাজনীতিবিদ, পুলিশ এবং জনপ্রতিনিধিদের নাম। প্রতিদিন গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়লেও তাদের বেশির ভাগই মাদকসেবী। সচেতন নাগরিকদের দাবি, ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করতে পারলে সর্বনাশা মাদকের বিস্তার অনেকটাই কমে আসবে।

দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চললেও সে অভিযানের ছোঁয়া লাগেনি খুলনায়। দেদার চলছে মাদকের বেচাকেনা। পুলিশের নিয়মিত অভিযানে মাদকসেবীদের গ্রেফতার করতে পারলেও ব্যবসায়ী এবং মাদকের পৃষ্ঠপোষকরা বরাবরই থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদকবিরোধী কার্যক্রমে তারাই এখন সরব হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় খুলনা জেলা ও মহানগরীর চিহ্নিত ২৭২ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। এসব ব্যবসায়ীর আশ্রয়দাতা হিসেবে তালিকায় ৫০ জনের নাম রয়েছে। আর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করে এমন ৩৪ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়দাতারা সবাই রাজনৈতিক নেতা। এ তালিকায় একজন এমপির নামও রয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, খুলনা মহানগরী এলাকায় মাদক কারবারিদের যারা সহযোগিতা করেন তারা হলেন- খুলনা-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মিজানুর রহমান মিজান, নগর আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক হাফেজ শামীম, নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম আসাদুজ্জামান রাসেল, খুলনা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক জাকির হোসেন বিপ্লব, কেসিসির কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র আনিসুর রহমান বিশ্বাস, ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামসুজ্জামান মিয়া স্বপন, নগরীর খালিশপুরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের অধিবাসী যুবলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত হোয়াইট, সরকারি বিএল কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি রাকিব মোড়ল। এ ছাড়াও শ্রমিক লীগ নেতা বাবুল শেখ, মো. শামসু, ইউনুচ মুন্সী, মো. ভাষান, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবিদ উল্লাহ, বাহা উদ্দিন খন্দকার, কালা মনির, আরাফাত সানি সোহাগ, কামরুল মাতুব্বর, শেখ খালিদ হোসেন, হাফিজুর রহমান হাফিজ, এফএম জাহিদ হোসেন জাকিরসহ মোট ২৮ জন।
তালিকা অনুযায়ী, জেলায় মাদকের পৃষ্ঠপোষকরা হচ্ছেন তেরখাদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক এফএম মহিদুজ্জামান, ওয়াহিদুল ইসলাম ফকির, আওয়ামী লীগ নেতা লিটন ঢালী, আজিজুল হক কাজল, ইউপি চেয়ারম্যান সাধন অধিকারী, আয়নাল হাওলাদার, ছাত্রলীগ নেতা রতন মণ্ডল, আজিজ হাওলাদার, মইনুল ইসলাম জুয়েল, এমএ রেজা বাচা, ইউপি চেয়ারম্যান গাজী জাকির। খুলনার ৯ উপজেলায় মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারি হিসেবে মহিলা ও পুরুষ মিলে ১১৮ জনের তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে তেরখাদায় ২২ জন, রূপসায় ২২ জন, দাকোপে ১৮ জন, পাইকগাছায় সাতজন, কয়রায় ১৫ জন, ডুমুরিয়ায় সাতজন, বটিয়ঘাটায় ছয়জন, দিঘলিয়ায় সাতজন ও ফুলতলায় ১২ জন।

উপজেলা পর্যায়ে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২ জনের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাহিদ, রূপসা থানার এএসআই রবিউল ইসলাম, দাকোপ থানার এএসআই সবুর হোসেন, পাইকগাছা থানার এসআই মোমিন, কয়রা থানার এসআই ইকবাল ও আজম, ডুমুরিয়া মাগুরঘোনা ক্যাম্প ইনচার্জ নাহিদ হাসান, বটিয়াঘাটা থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক, দিঘলিয়া থানার ওসি হাবিবুর রহমান ও এসআই মধুসুদন এবং ফুলতলার ওসি আসাদুজ্জামান। অন্যদিকে মহানগরীর আটটি থানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২২ জনের নাম তালিকায় উঠে এসেছে।

এরা হলেন খানজাহান আলী থানার শিরোমণি পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল শহীদুল ইসলাম, আটরা পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল মো. মিজান, দৌলতপুর পুলিশ ফাঁড়ির মিকাইল হোসেন, খালিশপুর থানার এসআই নুরু, সদর থানার এসআই শাহ আলম, আশরাফুল আলম ও সুব্রত কুমার বাড়ৈ, সোনাডাঙ্গা থানার এসআই সোবহান, এএসআই এমদাদুল হক ও নূরুজ্জামান, লবণচরা থানার এসআই মো. বাবুল ইসলাম, লবণচরা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মো. ওসমান গনি, লবণচরা থানার এসআই মনজিল হাসান, হরিণটানা থানার এএসআই মোহাম্মদ রিপন মোল্লা, সদর থানার এসআই টিপু সুলতান ও এসআই মিলন কুমার, খানজাহান আলী থানার এসআই রাজ্জাক, ইলিয়াস ও সুমঙ্গল।

এছাড়াও খুলনা মহানগরী এলাকায় স্থানীয় মাদকদ্রব নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থার তালিকায়  উঠে এসেছে খুলনা ইউনিভার্সিটি এলাকায় সরবরাহকারীরা হচ্ছেন নিখিল কুমার সাহা, ইলিয়াস হোসেন সোহেল, মো. রমজান আলীর ছেলে আলমগীর কবির খোকন, সোনাডাঙ্গা সোনালীনগর হাতেম আলী বাইলেনের বাবুল হোসেন সরদারের মেয়ে হোসনে আরা, সোনাডাঙ্গা থানা রোড এলাকার আল কাফি মল্লিক জনির স্ত্রী এমিলি রহমান বুবলি ও সোনাডাঙ্গা সোনালীনগর এলাকার ফকরুদ্দীন বাহাদুরের মেয়ে জাহানারা বেগম,রেলিগেটের ইসলাম শিকদার,হোসেন শেখের পুত্র সোহেল,রায়েরমহলের মৃত আকামের পুত্র ফান্টু মনির,মৃত জাকির মহুরীর পুত্র শামীম,জাহাঙ্গীর হোসেন কালু,রাব্বী মুন্সী,মৃত আলম সরদারের পুত্র ইমরান সরদার,রিয়াদ,হাফিজ@কালা হাফিজ,মারুফ@সিটি মারুফ, মৃত আবু বক্করের পুত্র সাদিকুর রহমান টিটু,নয়াবাটির আলামিন@ঘারবেকা আলামিন,কাশিপুরের রিয়াজের কন্যা পারভীন,দৌলতপুরের হোসেন শেখের পুত্র সোহেল শেখ,দক্ষিন কাশিপুরের রাশিদা বেগম,বেল্লাল@ খোরা বেল্লাল,হাউজিং বঙ্গবাসী এলাকার ছাত্তার আনসারী,পিয়ারু,মফিজুর রহমান মাজু,সাব্বিরের পুত্র সুমন,পিপলস রেললাইন এলাকার জাহানারা ওরফে জানু, হোসনে আরা ও লুৎফার নাহার লুতু,রাজু মোল্লা,সোহেল,আলামিন,মোস্ত@গাঁজা মোস্ত,ডালিম,পাঁচতলা কলোনীর শামীম,আরিফ,আলমনগরের বাবু @কাগজ বাবু@ ডিকসার বাবু,তাজনবী,সুরুজ,জাকির,বাপ্পী,রিয়াল,হাউজিং পুরাতন কলোনীর মনিরের পুত্র আলিম, এনামের পুত্র তানিম,আতিয়ারের পুত্র তুষার,নাদিমের পুত্র আরিফ,আমেনা বেগম।এছাড়া মহানগরীর অলিগলিতে খুচরা ও পাইকারী মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে । তাদের ধরতে বিভিন্ন সংস্থা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন ।

খুলনা পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্তদের প্রতিদিনই গ্রেফতার করা হচ্ছে। সোমবার খুলনায় ৪৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগের দিন রোববার ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সোনালী সেন যুগেরকন্ঠকে জানান, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

তবে ওয়াকিবহাল মহলের অভিযোগ, যাদে গ্রেফতার করা হচ্ছে এদের মধ্যে বেশির ভাগই মাদকসেবী। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মাদক ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাধর পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা দীর্ঘ হলেও এখনও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।