বাবাকে স্মরণঃ মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা

মঙ্গলবার, ২৯ মে, ২০১৮ ৩:১৬:৫৪ অপরাহ্ণ
0
256

পৃথিবীতে যার বাবা নেই সেই বুঝে বাবা কি জিনিস। না চাওয়ার আগেই বাবা তার সন্তানকে পছন্দের জিনিসটি হাতে তুলে দেয়, আর বলে বাবা তোর পছন্দ হয়েছে। বাবা ডাক টাও অনেক মধুর। বাবা যেন মাথার উপর বট বৃক্ষ। সেই বট বৃক্ষ যখন ঝরে যায় কিংবা হারিয়ে যায় তখন অনন্তকাল দুঃখ, কষ্ট আর যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে প্রতিটি পোহর কাটে। আমি পৃথিবীতে আসার আগেই বাবা কি জিনিস বুঝতে পেরেছি, কারণ জীবনে প্রিয়জনও নিজের অজস্র ছবি থাকলেও আমার বাবার একটি ছবিও আমার কাছে নেই। যখন কিছুই বুঝিনা, শিশুকাল বলতে যা বোঝায়, সেই কালেই বাবাকে হারিয়েছি। আমার মা-ই বাবা, বাবা-ই মা। মা এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তার কাছে আমি যেন সেই শিশুটিই রয়ে গেছি। ৪১ বৎসর আগে পবিত্র রমজানের ইফতারির ঠিক পূর্বক্ষনে ১৩ই রমজানে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন আমার বাবা। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ্য ছিলেন। পবিত্র রমজানেই তার ডাক পড়েছিল। সে কারণেই তিনি চলে গেলেন। আমাদের সংসারে দুই ভাই আমরা। বড় ভাই ও আমি ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই। এখন আমরাও বাবা হয়েছি, যার যার সংসার হয়েছে। দুই ভাইয়ের ঘরে আলাদা ১ ছেলে ১ মেয়ে হয়েছে। তারা এখন কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কেউ কলেজে পড়ে। আমরা আমাদের সন্তানের চাওয়ার আগেই তাদের পাওয়াটুকু পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। চোখে যেটি ভালো লাগে মনে হয় প্রিয় সন্তানের জন্য কিনে তাকে উপহার দেই। আমাদের ছেলে বেলা সব শখ মিটিয়েছে মমতাময়ী মা। আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছে, কিন্তু বাবার মতো হতে পারেনি। আমার বাবা ছিল একজন মানবতাবাদী মানুষ। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। মানুষের দুঃসময় পাশে থাকতে ভালোবাসতেন। তিনি ডাক বিভাগের একজন ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা ছিলেন। তার জীবদ্দশায় খালিশপুর বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদ, খালিশপুর ঈদগা মাঠ, খালিশপুর হাউজিং বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোয়ালখালী কবরস্থান, আঞ্জুমান মক্তব সহ অনেক কিছু প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার সকলের মুরুব্বী। তাই আজও বাবার মৃত্যুর এত বছর পরেও মানুষের ভালোবাসা পায়, বাবার কারণে। বাবার অনেক কিছু ছিল। কিন্তু আমাদের জন্য মাকে ছাড়া আর কাউকে রেখে যায়নি। জীবনযুদ্ধ কাকে বলে সেই ছেলে বেলা থেকেই দেখে আসছি। আজও যুদ্ধ থামেনি। যুদ্ধ করেই সৎভাবে জীবন-জীবিকা পালন করছি। সৎ মানুষের অনেক কষ্ট কিন্তু রাতে সস্তিতে ঘুমাতে পারে। আমিও সারাদিন কষ্ট করে রাতে সস্তিতে ঘুমায়। বাবা আমাকে সততা শিখিয়ে গেছেন। শিখিয়ে গেছেন মানুষের জন্য নির্লভ ভালোবাসা। মানুষকে ভালোবাসলেই যেন বাবাকে খুঁজে পাই। এবার রোজার মাসে প্রথম দিকেই খুলনায় ছুটে গিয়েছিলাম। বাবার কবরে গিয়ে অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখলাম গাছের নিচে মসজিদের পাশে গোলায়খালী কবরস্থানে বাবা শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। পাশেই খুলনা নেছারিয়া আলিয়া মাদ্রাসার এতিমদের সাথে কিছু সময় কাটালাম এবং বাবার জন্য তাদের কাছে দোয়া চাইলাম। জীবনের একটি সময় এই মাদ্রাসার প্রাঙ্গনে আমার মা আমাকে নিয়ে এসেছিল। সেই সময় ওমেদ আলী নামে একজন হুজুর ছিল। সময়ের ব্যবধানে আমার সেই প্রিয় হুজুরও না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমাদের সবাইকে এক সময় চলে যেতে হবে, বেঁচে থাকতে কেন এত অহংকার। অন্যায়ভাবে কার জন্য সম্পদের পাহাড় গড়ছি। আমি চলে গেলে সেই সম্পদ আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, এ কথাটি কি একবারও ভেবেছি। বাবা তুমি আর আসবে না। কিন্তু তোমার আদর্শ ও ভালোবাসা নিয়ে বাকীটা জীবন যেন কাটাতে পারি। আমার সন্তানদেরকে যেন তোমার মত সু-সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। তুমি জান্নাতে বসেই আমাদের জন্য দোয়া করো।