শিক্ষকদের চাপে গাইড বই কিনতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

শনিবার, ২ জুন, ২০১৮ ১১:৩১:০৫ পূর্বাহ্ণ
0
119

নড়াইল প্রতিনিধি

বছরের শুরুতেই উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতি বছরের মতো এ বছরও সরকার বিনামূল্যে বই সরবরাহ করলেও শিক্ষার্থীরা রক্ষা পাচ্ছে না গাইড বই থেকে। শিক্ষক নেতারা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে গাইড বই কিনতে বাধ্য করে শিক্ষার্থীদের। গাইড বই নিষিদ্ধ করে আইন করা হলেও দমানো যাচ্ছে না শিক্ষকদের।

জানা গেছে, নড়াইল জেলা শহরের বড় বাজার রূপগঞ্জ বাজার। এই বাজার ও আশেপাশের বই দোকান গুলোতে বিক্রি হচ্ছে সরকার নিষিদ্ধ গাইড বই। তৃতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে সব শ্রেণির গাইড বই অবাধে পাওয়া যায় এসব দোকানে। শিক্ষার্থীরাও বই কিনছে বিনা সংকোচে। বাজারের সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন বই এর দোকান ‘বাংলাদেশ লাইব্রেরী’। এই লাইব্রেরীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ছাপাখানায় নকল নোটবুক, গাইডবই ছাপিয়ে বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে, কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ প্রশাসনিক জটিলতায়ও পড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে যশোরের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে গাইড বই বাণিজ্যের মূল এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। এই দোকানে নিষিদ্ধ গাইড বই গুলো দোকানের ভিতরে স্টোরে থাকে আর বাইরে সাজানো থাকে বোর্ডের বৈধ বই, খাতা আর গল্পের বই। এছাড়া ন্যাশনাল লাইব্রেরী, নড়াইল লাইব্রেরী, পপুলার লাইব্রেরী, স্টুডেন্ট লাইব্রেরীসহ সব বইয়ের দোনকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে গাইড আর নোট বই।

গাইড বাণিজ্যের ব্যাপারে বাংলাদেশ লাইব্রেরীর মালিক সুবাস রায় জানান, গাইডতো নিষিদ্ধ কোন বই না। এর সাথে টেক্সবুক এর কোন মিল নাই। যশোরের হাসান বুক ডিপোর সাথে আপনারা যোগাযোগ করে বই বিক্রি করেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্কুলের স্যাররা নিজেরাই টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে আসে, তারাই ভালো বলতে পারবেন। এক’শ ধরনের গাইড আছে,ওষধের মতো কোন স্যার কোনটা লিখবে তা তারাই ভালো জানে। তিনি উল্টো বলেন, গাইড বন্ধ করা যাবে না, চাহিদা থাকলে তার সরবরাহ থাকবেই।

কোমলমতি গরীব ছাত্রদের নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে বাধ্য করে দিচ্ছেন খোদ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের অর্থলোভী কিছু শিক্ষক। শিক্ষকেরা ছাত্রদের সুনিদৃষ্ট কোম্পানীর গাইড বই কেনার জন্য চাপ দিয়ে বলছেন। গরীব শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের চাপে কিনতে বাধ্য হচ্ছে ১৩’শ থেকে ২২’শ টাকার মূল্যের গাইড। শিক্ষকরাই যেন ওই সকল বই প্রকাশনীর সেলসম্যান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর নড়াইল সদরের একটি শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে যশোরের হাসান বুক ডিপোর সাথে নেতৃবৃন্দের একটি গোপন চুক্তি হয়েছে। সমিতিভূক্ত ২৯টি স্কুলে হাসান বুক ডিপো এর জননী, একের ভিতর সব, বাংলা গ্রামার, ইংলিশ গ্রামার ও সল্যুশন এই ৪ ধরনের গাইড বই সরবরাহের বিনিময়ে সমিতিকে প্রদান করা হবে ৩০ লক্ষ টাকা। হাসান বুক ডিপোর কর্মকর্তা মিলন এই লেনদেনের মধ্যস্থতা করেছে।

নড়াইল সদরের আগদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহাদ আলীর বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ তিনি সহ সকল সহকারী শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত কোম্পানীর গাইড বই কিনতে বলেছেন।

অষ্টম শ্রেণির মিথিলা রহমান জানায়, আমাদের স্কুল থেকে স্যারেরা জুপিটার বই কিনতে বলেছে যার দাম ১৫’শ টাকা , কিন্তু আমি এতদিন টাকা জোগাড় করতে পারিনি বলে কিনতে পারিনি, টাকার জোগাড় হলে যে কোন দিন কিনবো।

আগদিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক আহাদ আলী গাইড বই বিষয়ে বলেন, সরকারিভাবে নিষিদ্ধ কোন বই আমরা বিক্রি করি না, আমরা ছেলেমেয়েদের গাইড বই কিনতে বাধ্য করি না। ছেলেমেয়েদের কাছে গাইড বই বিক্রি করে কোম্পানীর কাছ থেকে টাকা নেবার কথাও অস্বীকার করেন তিনি।

এসকল গাইড বাণিজ্যের মূলে রয়েছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। জেলার ৩ উপজেলায় শিক্ষকদের একাধিক সমিতি রয়েছে, এ সকল শিক্ষক নেতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে বিভিন্ন গাইড কোম্পানী। আর শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুলে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বই।

অভিযোগ আছে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ গত বছর জননী প্রকাশনী নামের একটি গাইড বই চালানোর বিনিময়ে ২০ লক্ষ টাকা উৎকোচ নিয়েছিলেন। এই টাকা বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের মধ্যে বন্টন করা হয়। সে সময়ে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রচার হলে এবছর এই বাণিজ্য অত্যন্ত গোপনে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদউদ্দিন আহম্মেদ গাইড বাণিজ্য প্রসঙ্গে বলেন, অর্থ প্রদানের অভিযোগ অনুমান নির্ভর এ ব্যাপারে আমার জানা নাই। তবে বিভিন্ন কোম্পানী স্কুলে গিয়ে নানা প্রলোভন দেখিয়ে গোপনে গাইড বই ঢুকায়। এটা বিচিত্র কিছু না সরকারি বয়েজ এবং গার্লস স্কুলের শিক্ষকেরাও এই বাণিজ্যের সাথে যুক্ত আছে।

অভিযোগের ব্যাপারে সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশীদ জানান, গতবছর এরকম একটি ঘটনা ঘটার পরে তা মিডিয়াতে আসে। একছর শিক্ষক সমিতির সাথে এ ধরনের কোন চুক্তি হয়নি, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরা নিজ উদ্যোগে গাইড বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকতে পারে।

সমিতির লেনদেনের কথা অস্বীকার করে শিক্ষকদের গাইড বাণিজ্যে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রুব কুমার ভদ্র বলেন, সমিতিভুক্ত কোন স্কুল বা বাইরের কোন স্কুল ব্যক্তিগতভাবে গাইড বই এর সাথে যুক্ত থাকতে পারে। শিক্ষকদের এই বাণিজ্যের কারনে শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস নামলেও সে ব্যাপারে কারো কোন মাথাব্যাথা নেই।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম আব্দুল খালেক গাইড বইয়ের সীমিত ব্যবহারের কথা ন্বীকার করে বলেন, শিক্ষকদের আমরা এ ব্যাপারে সতর্ক করবো এবং আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেবো। আমাদের যে কোন সভায় এ ব্যাপারটা গুরুত্বের সাথে দেখবো বলে জানান এই শিক্ষা কর্মকর্তা।