মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে: সিপিডি

শনিবার, ৯ জুন, ২০১৮ ১১:০১:০৩ পূর্বাহ্ণ
0
255

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য সহায়ক বেশ কিছু প্রস্তাবনা থাকলেও মধ্যবিত্তের জন্য তেমন সুখবর নেই। বরং, বাজেটের করজাল বিস্তারের কারণে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে বলেই মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা মোকাবিলায় নির্দেশনা ও কার্যকর পদক্ষেপ বাজেটে নেই বলেই মনে করে এ সংস্থা।

শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সিপিডির পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থার বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে সিপিডির আরেক বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেট গরিব ও উচ্চবিত্তদের জন্য সহায়ক। তবে মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়বে। বাজেটে দেশের বিকাশমান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে। আবার যারা নির্বাচনে অর্থায়ন করে তাদেরও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আর নির্বাচনে অর্থায়ন কারা করেন? তা সবাই জানেন। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ভোটের রাজনীতিতে যতটুকু গরিব মানুষের ভোটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, অর্থের প্রয়োজনে বিত্তশালীদের ভূমিকা বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, মধ্যবিত্তের ভূমিকাকে এখনও ততটুকু মূল্যায়ন করা হয় না। দেশের ক্রমান্বয়ে বিকাশমান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জনশক্তি গড়ে উঠছে, সে মধ্যবিত্তের কণ্ঠস্বর ঠিকমতো সমাজে না থাকার কারণে তাদের মূল্যায়ন এখনও হচ্ছে না। এ রাজনৈতিক অর্থনীতি যদি ঠিক না হয়। বিকাশমান মধ্যবিত্তের মূল্যায়ন যদি না হয়, তা হলে বণ্টনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে জনসেবা, জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্য এসবের কোনো উন্নতির সম্ভাবনা থাকবে না।

বাজেটে ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানোয় হতাশা প্রকাশ করে দেবপ্রিয় বলেন, আনুতোষিক ব্যয়ে ৭৫ লাখ টাকায় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সেটা উচ্চবিত্তের মানুষরা পাবেন। এটা বৈষম্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যখন কম আয়ের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে সুবিধা দেওয়া হলো না, কিন্তু উচ্চবিত্তকে আনুতোষিক ব্যয়ে সুবিধা দিচ্ছি, এটা অর্থনীতির সাম্যনীতিতে ঠিক হলো না। আবার উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড সেবা, ব্র্যান্ডের পোশাক ও আসবাব ও ই-কমার্স ব্যবসার ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে তরুণদের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে তা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যয় বাড়াবে।

এদিকে সামগ্রিক বিচারে সিপিডি আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে এক কথায় ‘নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, গতানুগতিভাবে বাজেটের আগে ব্যয় ঠিক করে তারপর আয়ের সংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।

দেবপ্রিয় বলেন, সিপিডি বারবার বলছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বলতম অংশ হচ্ছে চলতি হিসাব ও বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেন কাঠামো। যে পরিমাণে আমদানি হচ্ছে, তাতে সন্দেহ হচ্ছে এর মাধ্যমে টাকা বাইরে পাচার হচ্ছে। এটা যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখা যায়, আগামী অর্থবছরে আরও বেড়ে যাবে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, টাকার মূল্যমান হ্রাস পাবে। ডলারের দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৩ থেকে ৮৪ টাকা হচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতি হবে, জীবন যাত্রার ব্যয়ও বাড়বে।

সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাজেটের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি। চলতি অর্থবছরের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গেলে যে আয় তা অন্তত ৪০ শতাংশ বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা ও ব্যয়ের ক্ষমতা কমছে। এখন রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির ১০ শতাংশের মতো। এটা পৃথিবীতে সর্বনিম্ন হার। এটা যদি ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে উন্নীত হতো, তবে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারত সরকার। এক্ষেত্রে যাদের কর দেওয়ার কথা, তাদের কাছে পৌঁছতে পারছে না।

এডিপি নিয়ে সিপিডি বলছে, সরকারে অর্থ আয় কম হওয়ায় ব্যয়ও কম হচ্ছে। এ বছর নির্বাচনের বছর, তাই সরকারের সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়ের কথা ছিল। কিন্তু সরকার ব্যয় করতে চেয়েও করতে পারেনি। এটা অনেক বড় সমস্যা।

এ সময় ড. দেবপ্রিয় বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার ভাতা ও সংখ্যা বাড়িয়ে গরিবদের তুষ্ট করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বাজেটে। এদিক থেকে নির্বাচনি বাজেট হতে পারে। তবে এটি নেতিবাচকভাবে কিছু নয়। তবে নির্বাচনি বাজেট এক বছরে হয় না। এটির জন্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের পদক্ষেপ থাকতে হয়। তার জন্য ৫ বছরের বাজেট মূল্যায়ন করতে হবে। নির্বাচনের বছরে নির্বাচনমুখী ব্যয়ের কিছু পদক্ষেপ থাকতে পারে। এবারও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে বেশি বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।

তবে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য ঘোষিত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। এ বিষয়ে সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, ব্যাংকের করপোরেট হার কমানো ঠিক হয়নি। ব্যাংক খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির এ সময়ে তাদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া উচিত হয়নি। ব্যাংক খাতে যে নৈরাজ্য চলছে তার সমাধান না করে তাদের তুষ্ট করার যে ধারাবাহিকতা ছিল তাই বজায় রাখা হয়েছে। কিন্তু এর ফলেও তারল্য বাড়বে না। যখন ব্যাংক খাতের নৈরাজ্য চলছে, সবাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর কথা বলছে তখন, ব্যাংকে (পরিচালনা পর্ষদে) পরিবারের দৌরাত্ম্য আরও বাড়ানো হলো। পরিচালক দুইজন থেকে বাড়িয়ে তিনজন করা হলো। সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

বাজেটের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে দেবপ্রিয় বলেন, ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা পূরণ করতে হলে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ লাগবে, যা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। তাতে করে পুঁজির উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি এবং দেশের ভেতরের পরিস্থিতি মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও গভীর সংশয় রয়েছে। তাই প্রবৃদ্ধির অঙ্কের বদলে সে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবন মানে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে- সে দিকে নজর বাড়াতে হবে। প্রবৃদ্ধির হার উঁচু হতে পারে, প্রবৃদ্ধির হার নিচু হতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধিতে গরিব মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন হতে হবে, তাদের বেশি পেতে হবে। তবে, বাজেটে যে বাড়তি ব্যয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, তার বড় অংশ যাবে জনপ্রশাসন ও সুদ ব্যয় খাতে। সে তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির হার একটি জায়গায় আটকে আছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি অনুপাতে যে ব্যয় করা দরকার, সেটি নেই।

সিপিডির বিশেষ ফেলো বলেন, দেশে সম্পদ, ভোগ এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে। দেশের যারা সবচেয়ে গরিব, গত পাঁচ বছরে তাদের ৬০ শতাংশ আয় কমেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ মানুষের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ আয় বৃদ্ধি ঘটেছে। এখানে শ্রম ও উদ্যোগের তুলনায় পুঁজি এবং সম্পদকে বেশি পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এটা মেধাভিত্তিক অর্থনীতির জন্য ভালো খবর নয়।

সিপিডি বলছে, দেশের প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষার জায়গাগুলো অর্থনীতির শক্তিশালী দিক। অপর দিকে রাজস্ব আদায় ও এডিপি বাস্তবায়নে দুর্বলতা, কৃষকের প্রণোদনামূলক দাম না পাওয়া, বৈদেশিক আয়-ব্যয়ে চাপ ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি অর্থনীতির সমস্যার দিক। এক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ এখনও স্থবির হয়ে রয়েছে। কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির হার এবং গরিবের আয় বৃদ্ধির হার দুর্বল, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের গুণগত মান দুর্বল। এ কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিক দিয়ে দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সামনের দিনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, তা মোকাবিলায় বক্তব্য ও কার্যকর পদক্ষেপ বাজেটে নেই।

তবে সিপিডি বলছে, এবারের বাজেটের ভালো দিক হলো স্থানীয় শিল্পের প্রসারে নীতিসহায়তা, প্রতিবন্ধীবান্ধব হাসপাতালের সুবিধা, রুটি-বিস্কুট ও পাদুকার ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) তুলে নেওয়া ইত্যাদি। অপরদিকে তামাকজাত পণ্য রপ্তানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। সংস্থাটি মনে করছে, এতে দেশে তামাক উৎপাদন বাড়বে, যা সরকারের তামাক উৎপাদন বন্ধ করা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

উল্লেখ্য, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এতে ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আয়-ব্যয়ের পার্থক্য বা ঘাটতি থাকবে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। এর মধ্যে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা এবার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার কথাও বলা হয়েছে।