খুলনা জেল সুপারের পরিচয়ে অভিনব প্রতারণার ফাঁদ

বুধবার, ২৭ জুন, ২০১৮ ৬:০৯:৩১ অপরাহ্ণ
0
129

এইচ আর তানজিরঃ
খুলনা জেলা কারাগারের বন্দী মুক্তির প্রাককালে পরিবারের কাছ থেকে জেল সুপারের পরিচয়ে অভিনব প্রতারনার মাধম্যে একটি চক্রের অর্থ আদায় । আর এ অর্থ না দেয়া বন্দীদের অনত্র বদলীর হুমকি দিয়ে বন্দিদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে বিকাশ মারফত হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা । খুলনা জেলা কারাগার কেন্দ্রিক এ চক্রটির সাথে রয়েছে এক শ্রেনীর অসাধু জেল গেট পুলিশ ,কোর্ট মহুরী ও কতিপয় আইনজীবী । এদের সহায়তায় কারাগারের ভিতরের তথ্য বাহিরে প্রকাশ করেই মূলত বন্দীদের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় এখন খুলনা জেলা কারাগারের ফটকে নিত্য নৈমিত্যিক ঘটনা । কারা ফটকে সর্তকতা সত্বেও দিন যতই যাচ্ছে প্রতারনার কৌশল যেন নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে । প্রতারক চক্রটিকে ধরতে কারাগার কতৃপক্ষ সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় প্রতারক চক্রটি এখন বে-পরোয়া ।
খুলনা জেলা কারাগারে কোন শ্রেনীর মানুষ আসে তার কোন নির্দিষ্টতা নেই। দোষী না নির্দোষ তা বোঝা যায় মামলার রায়ের মাধ্যমে। কিন্তু এ সময় বিবাদীকে থাকতে হয় কারাগারে। আর এই সময় তার পরিবারের লোকের স্থান হয় কোর্ট বারান্দা আর কারাগারের বড় গেট। এ সময় পরিবারের সদস্যরা সর্বদাই হতাশা আর চিন্তার মধ্যে সময় পার করে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সহজ সরল মানুষের বিপদকালিন সময়ের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এক দল প্রতারক চক্র। হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এরা সুকৌশলে বন্দীর তথ্য নিয়ে প্রথমে বন্দীর আইনজীবির সাথে যোগাযোগ। এবং তার মাধ্যমে বন্দীর আতœীয় স্বজনদের ভীত করে। এমন ঘটনা এখন প্রতিনিয়তই ঘটছে খুলনা জেল কারাগারের বন্দীর পরিবারের সাথে।
এমন ভুক্তভোগী হাসান জনান, আমার বড় ভাই পারিবারিক মামলার কারনে সপ্তাহ খানেক খুলনা জেল কারাগারে ছিল। গত ২৬ জুন তিনি জামিন পান, তাকে নেওয়ার জন্য আমরা পরিবারের সদস্য সহ বিকালে খুলনা জেল কারাগারের সামনে অপেক্ষা করি। সেখানে থাকা জামিনের তালিকায় আমার ভাইয়ের নাম দেখতে না পেয়ে আমরা আইনজীবিকে ফোন করি। তিনি আমাদেরকে অপেক্ষা করতে বলেন। আমি কিছু সময় অপেক্ষা করার পর খুলনা জেল কারাগারের জেলার জান্নাতুল ফরহাদ সাহেবকে কল দেই। তিনি বলেন আপনার ভাইয়ের বেল-বন বিকাল ৫টা ২৫মিনিটে এসেছে, দেরি হবার কারনে আজ আমি তাকে ছাড়তে পারছি না। আগামীকাল সকালে তাকে ছাড়া হবে। আমি খুলনা জেল কারাগার থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য রওনা দেই। এমন সময় আমার ভাইয়ের আইনজীবি তৈয়বুর রহমান আমার মোবাইলে ফোন করেন। তিনি বলেন, আপনার ভাই জেলের মধ্যে মারারারি করেছে। জেল সুপার সামসুদ্দিন সাহেব আমাকে ফোন দিয়েছে। তিনি বলেন আপনার ভাই মারামারি করার জন্য দ্রুত ট্রাইবুনাল আইনে মামলা দেওয়া হবে এবং তাকে মাগুরা জেলে পাঠানো হবে। আপনি তারাতারি জেল সুপারের নাম্বারটা লেখেন এবং তার সাথে কথা বলে দেখেন কোন সমাধান করা যায় কিনা। তিনি আমাকে ০১৭৬৬৬৪৪৯৯৩ এই নাম্বারটি দেন। আমি এই নাম্বারে ফোন দেই। আর আমার ভাইয়ের নাম বলি। অপর প্রান্ত থেকে তিনি আমার ভাইয়ের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা সহ বেল-বন কোন সময় খুলনা জেল কারাগারে এসেছে সব কিছু আমাকে বলেন। আমি আমার ভাই কি করেছে জানতে চাইলে, তিনি বলেন আমার ভাই জেলের ভেতর মারামারি করেছে। আমি বললাম আমার ভাই একজন সহজ সরল ব্যাক্তি তিনি এই ধরনের কাজ করতে পারে না। তখন তিনি বলেন আমি সিসি ক্যামেরায় দেখেছি। আপনার ভাইয়ের অপরাধ নেই, তিনি কাউকে মারেনি বরং তাকে একজন মেরেছে। আমি বলেছি তবে আমার ভাইয়ের কেন শাস্তি হবে তিনি বলেন, যাই হোক তিনি মারামারির সংঙ্গে যুক্ত আমরা তার বিরুদ্ধে মামলা করবো আর তাকে মাগুরা জেলে পাঠানো হবে। আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করি, তিনি বলেন আমি জেল সুপার সামসুদ্দিন। আমি বলেছি একটু আগে আমার জেলারের সাথে কথা হয়েছে, তিনি তো আমাকে কিছু বলেনি। তিনি বলেন জেলার সাহেব বাহিরে আছেন, তিনি ঘটনা জানে না। আর এর একটু আগেই আমরা খুলনা জেল কারাগারের এক পুলিশ ভাইকে জেলার সাহেবের কথা জিজ্ঞাস করলে তিনিও বলেছিলেন জেলার সাহেব বাহিরে আছেন। এরপর আমি বলেছি এখন আমরা কি করতে পারি, তিনি বলেন আপনি পাঁচ হাজার এক টাকা জরিমানা দিলে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে। আমি বলেছি আমার কাছে এই মূহুর্তে এত টাকা নেই। আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমি আমার ভাইয়ের আইনজীবি তৈয়বুর সাহেবকে ফোন করে ঘটনাটি বলি, তিনি বলেন আপনার বাবাকে দিয়ে কথা বলান দেখেন জরিমানা কিছু কমানো যায় কিনা। আমার বাবা ০১৭৬৬৬৪৪৯৯৩ এই নাম্বারে ফোন দেয় এবং জরিমানা কমানোর জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি বলেন কোন কম হবে না। তারপর আমি দশ মিনিট পর টাকা যোগার করে তাকে ফোন দেই। আর তাকে বলি আমরা খুলনা জেল কারাগারের সামনে দাড়িয়ে আছি, আপনি বাহিরে আসেন। তিনি বলেন আমি এখন জেলের ভেতরে, আপনি ০১৭৬৬৬৪৪৯৯৩ এটা অফিসের বিকাশ নাম্বার আপনি এই নাম্বারে বিকাশ করুন। আমি এই নাম্বারে পাঁচ হাজার দশ টাকা বিকাশ করে দেই। এবং তাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করি টাকা পেয়েছেন, এবার আমার ভাইকে আজ ছাড়া যাবে? তিনি বলে হ্যা আজ ছাড়া যাবে, তবে আমাকে আরো এগারো শত টাকা দিতে হবে। আমি তাকে একটু কম নিতে বলি, তিনি এক হাজার বিশ টাকা পাঠাতে বলেন একই নাম্বারে। আমি খুলনা জেল কারাগারের সামনের বিকাশ দোকান থেকে তাকে টাকা পাঠাই। তিনি আমাদের খুলনা জেল কারাগারের সামনে ৩০মিনিট অপেক্ষা করতে বলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর, তাকে আবার ফোন করলে তিনি আমাদের আরো সময় অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর তিনি ঘটনাটি খুলনা জেল কারাগারের সামনে থাকা পুলিশদের জানান, তারা বলেন সামসুদ্দিন নামের কোন কর্মকর্তা আমাদের এখানে নেই। আর তারাই আমাদের ঘটনার হুবুহু বর্ননা দেন এবং বলেন এমন ঘটনা গতকালও ঘটেছে। বিষয়টি খুলনা জেল কারাগারের পুলিশরা জেলার সাহেবকে জানান এবং নাম্বারটি তারা তাদের মোবাইলে টাইপ করে দেখেন, চিনতে পারেন কিনা? তিনি আরো বলেন, একজন লোক এই ঘটনা শোনার পর আমাদের জেলার সাহেরে সাথে দেখা করাতে নিয়ে যান এবং আমাদের অপেক্ষা করতে বলেন। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর তিনি খুলনা জেল কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বলেন, আপনারা চলে যান এই নাম্বারের বিরুদ্ধে অ্যাকশান নেন, এটা জেল সুপারের নাস্বার না।
তিনি আরো বলেন, আমরা টাকা দিয়েছি খুলনা জেল কারাগারের সামনে থেকে আর যে আমার সাথে জেল সুপার পরিচয়ে কথা বলেছে সে খুলনা জেল কারাগারের লোক হতে পারে। তা না হলে আসামীর সকল তথ্য এবং কখন বেল-বন কারাগারে পৌছেছে আর জেলার এখন নেই এই সকল তথ্য বাহিরের লোক জানবে কিভাবে। আর যখন আমরা দেখেছি আইনজীবি আমাদের নাম্বারটা দিয়েছে আবার তিনিই বলেছেন জেল সুপারের নাম্বার তাই অবিশ্বাস করার সময় পাইনি। তাছাড়া এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন এখন টাকা দিয়ে বের না করে কাল এসে তোমার ভাইকে নিয়ে যাও। হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদকে আরো জানান ঘটনাটি একটি চক্র সুপরিকল্পিত ভাবে করছে যার সাথে খুলনা জেল কারাগার কতৃপক্ষ জরিত। এভাবে তারা আরো অনেক সহজ সরল মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ২৭ জুন খুলনা সদর থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেন, যার নং-১৫২১।
এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে খুলনা কারাগারের জেলার জান্নাতুল ফরহাদ জানান, ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তিন চারবার র‌্যাব, এসবির কাছে বিষয়টি জানিয়েছি কোন সুফল না পেয়ে আমার এক পুলিশ এসআই বন্ধুর মাধ্যমে ২৫ পৃষ্টার কল লিষ্ট বের করে গত বছর মে জুন মাসের দিকে র‌্যাবের কাছে দিয়েছি। তাছাড়া কোন বন্দীর কারাগারের ভেতরে মারামারি বা অসুস্থতার কারনে অন্য কোন কারাগারে প্রেরনের নিয়ম নেই। তিনি মনে করেন এই চক্রের সাথে নামধারি কিছু ভুয়া সাংবাদিক , মোহরি ও জেল বন্দী জড়িত। তিনি নিজে বাদী হয়ে গত ২৫ জুন ২০১৮ ইং তারিখে খুলনা সদর থানায় একটি জিডি করেন যার নং ৫০। গত তিন চার দিন যাবৎ এ বিষয়ে খুলনা সদর থানার ওসির সাথে আলাপ আলোচনা চলছে। আমরা একটি বিষয় আশংকা করছি তবে তদন্তের প্রয়োজনে বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি আরো কয়েকটি মোবাইল নাম্বার ০১৭৬৫১৭৭৪০১, ০১৭৮৭৫২১৪৪৪, ০১৭৬৬৬৪৪৯৯৩ দেন যেগুলো দিয়ে ইতোপূর্বে প্রতারণা করা হয়েছে। এর আগে গত বছর তিনি জনগণকে সচেতনতার জন্য কমিউনিটি রেডিওতে চিঠি, সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস কাবে বিষয়টি অবগত করেছেন। উচ্চ শ্রেনীর লোকেরা রেডিও না শোনায় ও বিষয়টি গুরুত্ব না দেয়ার কারনে একজন চেয়ারম্যানের স্ত্রী, একজন ব্যাংকার সহ আরো অনেকেই এই প্রতারণার শিকার হয়েছে।