নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের ২৯৩৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২১৫৭ কিলোমিটারই কাঁচা

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুন, ২০১৮ ১১:০৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ
0
162

এস.এম. হালিম মন্টু.নড়াইল:

উন্নয়নের মহা সড়কের ছোয়া লাগছে না নড়াইলের গ্রামীন জনপথের । নড়াইলের গ্রামীন জনপথের বিভিন্ন যাতায়াতের সড়কগুলি দীর্ঘ কয়েক যুগেও পাকাকরণ হয়নি । যা হয়েছে তাও সংস্কারের অভাবে চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়ছে । নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নড়াইলের গ্রামীন জনপথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের চেষ্টা করছে না ? নাকি সংশ্লিষ্ঠ বিভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ বরাদ্ধ দিচ্ছে না তা নড়াইলের জনগন বুঝতে পারছে না । নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধিন জেলায় ২ হাজার ৯৩৭ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে যার মধ্যে ২হাজার ১৫৭ কিলোমিটার সড়ক এখনও কাঁচা রয়েছে । নড়াইলবাসি জেলার উন্নয়নের মুল প্রতিবন্ধকতা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সড়ক ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অবশ্য বলেছেন নড়াইলের গ্রামীন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দেশের অন্য জেলার ন্যায়ই হচ্ছে ।

জানা গেছে, নড়াইল এলজিইডির অধিনে জেলায় মোট ২হাজার ৯৩৭ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। যার মধ্যে ২ হাজার ১৫৭ কিলোমিটার সড়কই কাঁচা। বিভিন্ন সময়ে হেরিংবনসহ ৭৭৯ কিলোমিটার সড়ক পাকা হলেও বর্তমানে অধিকাংশ সড়কই চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। সড়কগুলি দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কার করা না হওয়ার ফলে অধিকাংশ সড়কই চলাচলে অযোগ্য হয়ে পড়ছে। জেলার তিনটি উপজেলায় ৮২৯টি সড়ক রয়েছে এর মধ্যে সরাসরি উপজেলার সাথে সংযোগ রয়েছে ২৮টির । ইউনিয়ন এর সাথে যোগাযোগ রয়েছে ২৯টি এবং অধিক গুরুত্বপূর্ন গ্রাম সড়ক রয়েছে ১৬৪ টি, কম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আছে ৬০৮টি। নড়াইল সদরে ৯০৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা রয়েছে ১৭২ কিলোমিটার। লোহাগড়া উপজেলায় ৮১৬ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা রয়েছে ১৯২ কিলোমিটার এবং কালিয়া উপজেলায় ৫৭৩ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা রয়েছে ১৫৬ কিলোমিটার।

লোহাগড়া উপজেলার এড়েন্দা-লুটিয়া ১৪ কিলোমিটার পাঁকা সড়ক প্রায় এক বছর আগে সড়কটি সংস্কার করা হলেও বর্তমানে এ সড়ক করুণ দশায় পরিনত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় খানাখন্দ ও ছোট বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে আমাদা আদর্শ কলেজসহ ছয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এবং ১৫টি গ্রামের লোকজন যাতায়াত করেন। কিন্তু ৪ মাসের বেশি সময় পিচ ও খোয়া উঠে সড়কে কাঁদামাটি বের হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সড়কে ভারি যানবাহন যেমন চলতে পারছে না, তেমনি পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সড়কের বিশাল বিশাল গর্তে এখন মরণ ফাদে রূপ নিয়েছে ।

সদরের বিষ্ণুপুর-মালিডাঙ্গা গুরুত্বপূর্ণ এ পাকা সড়কটির পুর্ব ও পশ্চিম পাশে পাকা রয়েছে কিন্তু মাঝখানে চরমালিডাঙ্গা এলাকায় প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়ক কাঁচা থাকায় মানুষ চরম দূভোগের স্বীকার হচ্ছে । এখানে সামান্য বর্ষা হলেই কাঁদায় একাকার হয়ে যায় । ফলে সড়কটির দুপাশে পাকা থাকলেও শুধুমাত্র চরমালিডাঙ্গা সামান্য এলাকা পাকা না করায় মানুষের কোন উপকারেই আসছে না এ সড়কটি ।

পৌরসভার শেষ সীমানা ধেকে ননিক্ষির গ্রাম পর্যন্ত দুকিলোমিটার রাস্তা দীর্ঘদিন যাবৎ কাঁচা রয়েছে । এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শতশত মানুষ শহরে আসা যাওয়া করে । কিন্তু বর্ষার মৌসুমে এত কাঁদা আর পানি জমে যায় যে, এ পথে চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়।স্থানীয়রা বহুবার সড়কটি পাকা করণের দবি করলেও তা হয়নি। লোহাগড়া -লাহুড়িয়া পাকা ২০ কিলোমিটার সড়কের অধিকাংশ স্থানে পিচ ও খোয়া উঠে খানাখন্দে পরিনত হয়েছে । মানুষের জীবনের ঝুকি নিয়েই এ সড়কে চলছে যানবাহন।

এ সড়কের জয়পুর মোড়ের উভয় পাশে পিচ ও খোয়া উঠে দেবে গেছে, জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন মাগুরা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইল হাজার হাজার মানুষ প্রয়োজনীয় কাজকর্মসহ ব্যবসা বানিজ্য ও উৎপাদিত কৃষি পন্য এ সড়কের উপর দিয়ে আনা নেওয়া করে। ফলে এ সকল সড়ক উন্নত না হওয়ার কারণে ্রগামীন জনপথে উন্নয়নের তেমন একটা ছোয়া লাগেনি।

লোহাগড়া – বকজুড়ি খেয়াঘাট পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সড়কটিও একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৫ বছর আগে এ সড়কে পিচ এর কাজ হয়েছে । এরপর এ সড়কে সংস্কার না হওয়ার কারণে। সমস্যা বেড়েই চলেছে । এ সড়কে নিয়মিত দূর্ঘনারস্বীকার হচ্ছে মানুষ। এ সড়কে নড়াইল-যশোর-আলফাডাঙ্গা যোগাযোগের একটি বড় ভুমিকা রাখে কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ এ সড়কের সিডি বাজার থেকে বকজুড়ি খেয়াঘাট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকার পিচ ও খোয়া উঠে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সিডি বাজার এলাকায় ধসে পড়েছে সড়কটি।

লোহাগড়া-লাহুড়িয়া সড়কের শিয়রবর থেকে মাকড়াইল পর্যন্ত সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়ক ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যায়ে কার্পেটিং এর কাজ শুরু করে ফরিদপুরের ভাঙ্গার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সড়কের কাজে নি¤œমানের খোয়া ব্যবহার করায় বিক্ষোভ করে স্থানীয় জনগন। প্রতিবাদের মুখে সে কাজ বন্ধ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় । সম্প্রতি এ সড়কের কাজ আবারও শুরু হয়েছে । এছাড়া সদরেও পাকার পাশাপাশি অসংখ্য কাঁচা রাস্তা রয়েছে । যা জেলার গ্রামীন জনপথের উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে ।

নলদী ইউনিয়নের মিঠাপুর এলাকায় চাকুলিয়া গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভাটুদাহ পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে ৬ কিলোমিটার রাস্তা কাঁচা যা বর্ষা মৌসুসে চলাচল করা যায়না । চাকুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নহাটা সড়কে গিয়ে মিসেছে ১কিলোমিটার ইটের সোলিং রাস্তা । এটি এখন মানুষের জন্য মরণ ফাদে পরিনত হয়েছে । একই এলাকা থেকে কালিগঞ্জ রোড পর্যন্ত ১ কিলোমিটার পাকা রাস্তা খানাখন্দে ভরে গেছে ।


মিঠাপুর এলাকার মিঠু মোল্য বলেন, নলদী ইউনিয়নে এলজিইডির অসংখ্য কাঁচা রাস্তা রয়েছে যা রাস্তা আজও পাকা হয়নি । ফলে পাকা না হওয়ার কারণে এলাকায় আজও তেমন একটা উন্নয়ন হয়নি । বৃষ্টির মৌশুমে কাঁচা রাস্তা গুলিতে হাটু সমান কাদা হয়ে যায়। বছরে ৬ মাসেরও বেশি সময় এসব সড়ক দিয়ে কোন যানবহন চলাচল করতে পারেনা। এমনকি পায়ে হেটেও চলাচল করা যায়না। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করতে পারেনা। হাট-বাজারেও নিতে পারেনা। শুধু তাই নয় এখানকার শতশত শিক্ষার্থীরা এ সময় স্কুল কলেজে আসা যাওয়া করতে পারে না।

লাহুড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান দাউদ হেসেন বলেন, লোহাগড়া-লাহুড়িয়া সড়কের শিয়রবর থেকে মাকড়াইল পর্যন্ত সড়ক ঠিকাদারের খামখেয়ালীতে নি¤œমানের খোয়া দিয়ে রাস্তার কাজ শুরু হয়। উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে ঠিকাদারের সখ্যতার জন্যই নি¤œমানের খোয়া ব্যবহার হচ্ছিল। এলাকাবাসীর সঙ্গে প্রতিবাদ করতে আমিও যোগ দিয়েছিলাম। তিনি আরো বলেন গ্রামের উন্নযনে মুলভুমিকা রাখতে পারে যোগাযোগ ব্যবস্থা । আমাদের এ অঞ্চলে রাস্তা থাকলেও বেশীরভাগ কাঁচা । পাকা যা আছে তাও আবার চলাচলে অযোগ্য হয়ে পড়ছে ।

জয়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকতার হোসেন জানান, লোহাগড়া-লাহুড়িয়া সড়কের শিয়রবর থেকে মাকড়াইল সড়ক পথে ফরিদপুর বোয়ালমারী উপজেলায় যাতায়াতে দূরত্ব কম। এ পাঁচ কিলোমিটার পথ চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় ব্যাবসায়ীরাসহ অনেকই ২০ কিলোমিটার ঘুরে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী হয়ে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারীতে পরিবহনসহ যাতায়াত করে। সড়কের উন্নয়ন হলে এলাকার দ্রুত উন্নয়ন করা সম্ভব। সড়কের উন্নয়ন ছাড়া কখনও কোন এলকা উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। তিনি এলজিইডির দ্বায়ত্বহীনতাই নড়াইলের গ্রামীন সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে না বলে মনে করেন।

সাংবাদিক রূপক মূখার্জী বলেন, নড়াইল এলজিইডির সড়ক সমস্যার কারণে গ্রামাঞ্চলে আজও তেমন একটা উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি । দেশ উন্নয়নের মহা সড়কে চলছে । কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধিন গ্রামীন জনপথের সড়কের বেশীরভাগই উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি । নড়াইলের এ সকল গ্রামাঞ্চলের সড়কগুলি চলাচলে অনুপযোগী হওয়ার কারণে ব্যবসা বনিজ্য,ফসল আনা-নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে । নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অবহেলার কারণে আমরা উন্নয়ন মহা সড়ক থেকে থেকে পিছিয়ে পড়েছি ।

নড়াইল উন্নয়ন কমিটির নেতা কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, বেশিরভাগ গ্রামীণ রাস্তা সমূহ এখনও কাঁচা থাকায় তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রান্তিক কৃষক তার কৃষি পণ্যসহ অন্যান্য উৎপাদিত মালামাল বাজারজাতকরণে প্রতিনিয়ত বিপাকে পড়তে হয়। এ অঞ্চলের অধিকাংশ রাস্তাই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ সকল রাস্তা দ্রুত পাকাকরণ প্রয়োজন। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন হলে প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি পণ্য বিপননের সুযোগ পাবে। এলাকার এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষভাবে অবদান রাখতে পারবে।

নড়াইল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর্জ নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষি প্রধান জেলার মধ্যে অন্যতম জেলা হিসাবে পরিচিত নড়াইল জেলা। এ জেলার উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল জেলার চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হয়। কৃষিপন্য জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ও বাইরের জেলাতে রপ্তানি করা হয়। কিন্তু জেলার অধিকাংশ সড়কের বেহাল অবস্থার কারনে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পন্য সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে পারছেনা। ফলে কাঁচা সড়ক পাকা করণ এবং চলাচলে অযোগ্য সড়ক সংস্কার প্রয়োজন।

নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবু ছায়েদ বলেন, নড়াইলের গ্রামীন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দেশের অন্য জেলার ন্যায়ই হচ্ছে । সড়ক উন্নয়নে সব সময়েই চারটি জেলা নিয়ে প্রজেক্ট হয় । ফলে একটি জেলা এককভাবে রাস্তা পাকা করার সুযোগ পায় না । তবে আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি নিজেদের জেলার রাস্তার উন্নয়নের জন্য । সেটা এমপি মহদয়দের মাধ্যমে আবার আমাদের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে । রাস্তা পাকাকরনের জন্য প্রস্তাবনা তৈরীসহ বিভিন্ন সড়ক মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অর্থ পেলে সড়ক সংস্কার করা হবে। তিনি আরও জানান, পর্যায়ক্রমে আমরা গ্রামের কাঁচা সড়কগুলিও পাকা করব।