তিন পার্বত্য জেলার স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণে নতুন রেগুলেশন

বৃহস্পতিবার, ১২ জুলাই, ২০১৮ ১:১১:৫৫ অপরাহ্ণ
0
182
অনলাইন ডেস্ক:

তিন পার্বত্য জেলার স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখলে নতুন করে একটি রেগুলেশন তৈরি করছে সরকার। নতুন এই রেগুলেশন অনুসারে বেসরকারি ব্যক্তি ও সংস্থার জন্য স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণের আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। বেসরকারি ব্যক্তি বা সংস্থার জন্য স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ বা হুকুম দখলের প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসক সরকারের পূর্বানোমোদন সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মতি সাপেক্ষে লিখিত আদেশ দিয়ে প্রয়োজন ও জনস্বার্থে যে কোন স্থাবর সম্পত্তি সাময়িকভাবে হুকুমদখল করতে পারবেন।

প্রয়োজন ও জনস্বার্থে সরকারের পূর্বানোমোদন এবং সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মতি সাপেক্ষে লিখিত আদেশ দিয়ে জেলা প্রশাসক যে কোন স্থাবর সম্পত্তি সাময়িকভাবে হুকুম দখল করতে পারবে। যুক্তিসংগত কোনো কারণে হুকুম দখলের আগে সরকারের পূর্বানোমোদন নেওয়া সম্ভব না হলে ভূতাপেক্ষভাবে সরকারের অনুমোদন গ্রহণ করা যাবে। পরিবহণ বা যোগাযোগ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষন কাজে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মালিক বা তার পরিবারের প্রকৃত আবাসস্থল, ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠঅণ, এতিমখানান, হাসপাতাল, গণগ্রস্থাগার, কবরস্থান, বা শ্মশাননের স্থাবর সম্পত্তি হুকুম দখল করা যাবে না। অধিগ্রহণের ফলে ক্ষগ্রিস্থ পরিবারকে পুনর্বাসন করতে হবে।

কেন এই রেগুলেশন
সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত এবংমন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে পুরাতন সব আইনকে হালনাগাদ করা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় দি চিটাগং হিল ট্রাক(ল্যান্ড একুইজেশন) রেগুলেশন ১৯৫৮ নতুন করে প্রণয়ন করা হচ্ছে। যা পার্বত্য জেলাসমূহের স্থাবর সম্পত্তি ও হুকুম দখল রেগুলেশন ২০১৮ নামে অভিহিত হবে। ভূমি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নতুন এই রেগুলেশনের খসড়া প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাতামত চেয়েছে।  নতুন এই রেগুলেশন প্রণয়ন করতে গিয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় একমত হতে পারেনি। রেগুলেশন তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন নামে ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একটি সম্পূর্ণ নতুন আইন করা হয়েছে। যা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।

ওই আইনে পার্বত্য তিন জেলাসহ দেশের সকল অঞ্চলের জন্য অভিন্ন বিধিবিধান রাখা হয়েছে। অধিগ্রহণ মূল্য হাল নাগাদ করে তিনগুন করা হয়েছে। পার্বত্য তিন জেলার ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখলের ক্ষেত্রেও অধিগ্রহণ মূল্য তিনগুন নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই আইনের প্রয়োগিক বিধিবিধান সবিস্তারে বর্ণানা করে একটি বিধিমালা তৈরির কাজও চুড়ান্ত করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। কিন্তু জাতীয় স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ মানছেন না। তাদের জন্য আলাদা করে আইন ও বিধি প্রবিধি তৈরি করার জন্য বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা জানান, ১৯৫৮ সালের স্থাবর সম্পত্তি অগ্রিহণ ও হুকুম দখল রেগলেশনে তিন পার্বত্য জেলায় ভূমি মূল্যের ১৫ ভাগ ভূমি মালিককে দেওয়া হতো। ১৯৮২ সালে এসে ওই রেগুলেশর সংশোধন করে যে রেগুলেশন তৈরি করা হয়েছে,সেখানে ৫০ ভাগ মূল্য ভূমি মালিককে দেওয়ার বিধান করা হয়। তখন কিন্তু তিন পার্বত্য জেলার ভূমি অধিগ্রহণ করা হলে আইনে ১৫ ভাগ থাকলেও তাদের ৫০ ভাগ মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। তারা তখন তা গ্রহণ করেছেন এবং কোন আপত্তি তোলেন নি। এখন ২০১৭ সালে নতুন করে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইনে অধিগ্রহণ মূল্য তিনগুন করার পরও তারা অজ্ঞাত কারণে আপত্তি তুলছেন। কর্মকর্তারা জানান, আমরা ভারত ও শ্রীলংকার ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিধিবিধান সংগ্রহ করে দেখেছি। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে নিজেদের মতো করে আইন তৈরি করেছে এবং তারা করতেই পারে। কারণ ওই দেশ পৃথক পৃথক রাজ্য রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশেতো কোন রাজ্য নেই। পৃথক কোর প্রভিন্স নেই। এখানে একটি আইন দেশের সব অঞ্চলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্যহবে। হ্যাঁ বিশেষায়িত অঞ্চল হিসেবে বিশেষ বিধান থাকতেই পারে। সব দিকে বিবেচনা করে আমরা তিন পার্বত্য জেলার জন্য নতুন করে রেগুলেশন তৈরি করছি। তারাও তাই চাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত এটা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে গেলে আর রেগুলেশন থাকবে না। বরং নতুন আইন হিসেবেই অভিহিত হবে। কারণ যে কোন বিষয়ের ওপর প্রথম আইন থাকে। আইনের অধীনে থাকে বিধিমালা বা রুলস এবং বিধিমালার অধীনে থাকে প্রবিধি বা রেগুলেশন। রেগুলেশন কখনই পূর্ণাঙ্গ আইনের মর্যাদা পেতে পারে না। পাওয়ার কথাও না। সুতরাং নতুন করে আবার পার্বত্য তিন জেলার জন্য অবশ্যই বিধিমালা বা রুলস তৈরি করতেই হবে।

যা আছে নতুন এই রেগুলেশনে
এই রেগুলেশন পার্বত্য জেলা সমূহের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ওহুকুমদখল ২০১৮ নামে অভিহিত হবে। ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন বা উভয়ের বিনিময়ে স্থাবর সম্পত্তির স্বত্ব ও দখল গ্রহণ করা হবে। অর্থ কাউকে ক্ষতিপূরণ কিংবা পুনর্বাসন ছাড়া অধিগ্রহণ করা যাবে না। সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিগ্রহণ করা যাবে। ভূমি মালিক বলতে স্থাবর সম্পত্তির স্বত্বাধীকারি ও বৈধ দখলদারকে বা উভয়কেই বুঝাবে। নতুন এই রেগুলেশনে অধিগ্রহণের আগে যৌথ তালিকা প্রস্তুতের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভূমির ওপর বিদ্যমান স্বত্ব বা অধিকার এবং ইহার উপরিস্থিত অবকাঠামো, ফসল, ও বৃক্ষরাজিসহ সকল বিষয়ের বিবরণ সংবলিত তালিকা প্রস্তুত করা হবে। অর্থাৎ স্থাবর সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থা ও প্রকৃতি, অবকাঠামো, ফসল, ও বৃক্ষরাজিসহ সকল কিছুর ভিডিও ও স্থিরচিত্র অথবা অন্য কোন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ধারণ করে বিবরণী প্রস্তুত করা হবে।  আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা থাকুক না কেন, এই রেগুলেশনের বিধানাবলি পার্বত্য জেলাসমূহের ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

খসড়া রেগুলেশনে আরো বলা হয়েছে,অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অধিগ্রহণাধীন অথবা অধিগ্রহণ হতে পারে এমন ভূমির ওপর জনস্বার্থ বিরোধী উদ্দেশ্যে কোন ঘরবাড়ি বা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে কি না বা নির্মাণাধীন কি না তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক নির্ধারিত পদ্ধতিতে তালিকায় উল্লেখ করবেন। প্রস্তুতকৃত তালিকা স্থানীয় ভূমি অফিসের নোটিশ বোর্ডে এবং প্রকল্পের সুবিধাজনক স্থানে প্রদর্শণের ব্যবস্থা করবেন। স্থাবর সম্পত্তির পরিমান ৫০ বিঘার ওপর হলে জেলা প্রশাসক নিজ মতামতসহ প্রতিবেদনের নথি সিদ্ধান্তের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। আর যদি অধিগ্রহণকৃত ভূমির পরিমান ৫০ বিঘার কম হয় তা হলে জেলা প্রশাসক নিজ মতামতসহ নথি বিভাগীয় কমিশনারের কাছে সিদ্ধান্তের জন্য পাঠাতে হবে। অধিগ্রহণের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারকে পুনর্বাসণের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। পার্বত্যজেলা সমূহের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখলের ক্ষেত্রে এই রেগুলেশনে বর্ণিত নেই এ ধরণের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭ এর বিধানাবলী প্রযোজ্য হবে।

এই রেগুলেশনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনে যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট কোন এলাকার জন্য আরবিট্রেটর নিয়োগ করবে। কেউ ক্ষতিপূরণ গ্রহণে জেলা প্রশাসকের নির্ধারিত হার না মানলে নোটিশ জারির ৪৫ দিনের মধ্যে আরবিট্রেটরের কাছে আবেদন করতে হবে। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে আরবিট্রেটরের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এই রেগুলেশন কার্যকর হলে ১৯৫৮ সালের দি হিল ট্রাকস(ল্যান্ড একুইজেশন) রেগুলেশন বাতিল বলে গণ্য হবে। রেগুলেশন রহিত হওয়া সত্বেও উহার অধীনে কৃত কাজকর্ম, গৃহীত কোন ব্যবস্থা, কার্যধারা, নতুন রেগুলেশনের অধীনে গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে। আরবিট্রেটর বা আরবিট্রেশন আপিলেট ট্রাইব্যুনালে কোন কার্যধারা নিষ্পন্নাধীন থাকলে তা নিষ্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তা এমনভাবে চলমান থাকবে যেন উক্ত রেগুলেশর রহিত হয়নি। এই রেগুলেশনের বাংলা ও ইংরেজি দুইটি নির্ভরযোগ্য পাঠ থাকবে। বাংলা ও ইংরেজীর মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রধান্য পাবে।