শতভাগ পেনশন তোলার সুবিধা ফেরত চান সরকারি চাকরিজীবীরা

বৃহস্পতিবার, ১২ জুলাই, ২০১৮ ১০:৩৩:৩২ পূর্বাহ্ণ
0
156
অনলাইন ডেস্ক:

চাকরি শেষে পেনশন সুবিধা তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আগের নিয়মে ফিরে যেতে চান। বর্তমান নিয়মে তারা সরকারের কোষাগারে পেনশনের ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের বিধান মানতে নারাজ। অনেকে এ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ।

তাদের জোরালো দাবি, ৫০ ভাগ পেনশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি যতই শক্ত হোক না কেন, তা যদি সুবিধাভোগীকে বেকায়দায় ফেলে দেয় তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং সরকার যদি একেবারে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না চায় সে ক্ষেত্রে এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলক একটি সমীক্ষা চালাতে পারে।

সেটি হল- পেনশন সংরক্ষণে বাধ্যতামূলক শব্দটি প্রত্যাহার করে নেয়া। অর্থাৎ যিনি চাইবেন তিনি পুরো পেনশন এককালীন তুলে নিতে পারবেন। এভাবে এক বছরের পেনশন সুবিধা জরিপ করে সরকার যদি দেখতে পায় বেশিরভাগ কর্মকর্তা পেনশনের অর্ধেক টাকা সংরক্ষণ করছেন তাহলে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বহালে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু জোর করে এভাবে চাপিয়ে দিলে সরকারি দলের প্রতি পেনশনভোগীরা স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ হবেন।

অবশ্য চাকরিজীবীবের কেউ কেউ অর্ধেক পেনশন সংরক্ষণ করার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারের কাছে পেনশনের অর্ধেক সংরক্ষণ থাকাটা সারা জীবনের এক ধরনের আর্থিক নিরাপত্তা। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে কোনো ধরনের অর্থ সংকটের মুখে পড়তে হবে না। পাশাপাশি কারও ওপর নির্ভরশীল হয়েও থাকতে হবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী  বলেন, ‘পেনশনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সারা জীবনের নিরাপত্তা। বর্তমানে পেনশনের ক্ষেত্রে যে নিয়ম চালু রয়েছে সেটা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। দেশের জনগণের গড় আয়ু এখন অনেক বেড়েছে। আগে একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে গেলে একেবারে বুড়ো হয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে অবসরের পরও একজন সরকারি চাকরিজীবী অনেক দিন বেঁচে থাকার মতো অবস্থায় থাকেন। এমনও হয় একসঙ্গে পেনশনের সব অর্থ তুলে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো খাতে বিনিয়োগ করে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে যান। ফলে জীবনের শেষ বছরগুলোতে তাদের জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ কষ্ট।’

তিনি আরও বলেন, ‘১০০ ভাগ পেনশন সমর্পণ করা এমন সরকারের সাবেক উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা শেষ বয়সে নিঃস্ব হয়েছেন। মানবিক দিক বিবেচনায় তারা পুনরায় তাদের পেনশন সুবিধা চালুর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। ফলে সরকার সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন নিয়ম চালু করেছে।’

তবে বাধ্যতামূলক সংরক্ষিত ৫০ শতাংশ পেনশনের ওপর সরকার প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে। গত পহেলা জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বিক্রির বিধান ছিল। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার সম্পূর্ণ পেনশন বিক্রি করে তার প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ এককালীন উত্তোলন করতে পারতেন।

তিনটি প্রধান কারণ বিবেচনায় নিয়ে সরকার পেনশন সংক্রান্ত নতুন বিধান চালু করেছে। এগুলো হচ্ছে- পেনশনভোগীর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ হ্রাস ও পেনশনের অর্থ বিনিয়োগে নিয়ে আসা। এ ছাড়া নতুন বিধান প্রণয়নের পেছনে আরও দুই কারণ রয়েছে। এক পেনশনের অর্থ সরকারের কাছে থাকলে এটি এক ধরনের বিনিয়োগ।

 

সরকার ও পেনশনভোগী উভয়ই এ টাকা বিনিয়োগ করে লাভবান হবেন। দ্বিতীয় হচ্ছে পেনশনের টাকা একসঙ্গে প্রদান করার কারণে সরকারের আর্থিক ব্যয়ের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সরকারকে এখন আর্থিক চাপে পড়তে হবে না।

 

 

জানা গেছে, বর্তমান প্রায় ৯ লাখ অবসরভোগী সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী পেনশন পাচ্ছে। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ থাকছে ১৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

 

বিদ্যমান অষ্টম বেতন স্কেল অনুযায়ী চাকরির বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা তার পরিবার পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। একজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকরির প্রথম ৫ বছর পূর্ণ হলে পেনশন পাবেন ২১ শতাংশ হারে। ৬ বছর পূর্ণ হলে ২৪ শতাংশ, ৭ বছরে ২৭ শতাংশ, ৮ বছরে ৩০ শতাংশ, ৯ বছরে ৩৩ শতাংশ এবং ১০ বছরে ৩৬ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন।

 

এ ছাড়া চাকরির বয়স ১১ বছর পূর্ণ হলে ৩৯ শতাংশ, ১২ বছরে ৪৩, ১৩ বছরে ৪৭ শতাংশ, ১৪ বছরে ৫১ শতাংশ, ১৫ বছরে ৫৪ শতাংশ, ১৬ বছরে ৫৭ শতাংশ, ১৭ বছরে ৬৩ শতাংশ, ১৮ বছরে ৬৫ শতাংশ, ১৯ বছরে ৬৯ শতাংশ এবং ২০ বছর পূর্ণ হলে ৭২ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবী। আর একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর চাকরির বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলে ৭৫ শতাংশ, ২২ বছরে ৭৯ শতাংশ, ২৩ বছরে ৮৩ শতাংশ, ২৪ বছরে ৮৭ শতাংশ এবং ২৫ বছর পূর্ণ হলে ৯০ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন।

 

এ ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকরির বয়স ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম বা মৃত্যু হলেও প্রতিবছর বা তার অংশবিশেষের জন্য সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর সর্বশেষ প্রাপ্য বেতনের তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা হিসেবে পাবেন তার পরিবার।

এর আগে, পুরাতন বিধানে অবসরে যাওয়া যেকোনো সরকারি চাকরিজীবী তার পেনশনের শতভাগ সরকারের কাছে সমর্পণ বা বিক্রি করে দিতে পারতেন। ফলে তিনি একবারে অনেকগুলো টাকা পেতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে পেনশনের ৫০ ভাগের বেশি সমর্পণ করা যাবে না। পেনশনের শতভাগ সমর্পণ বিধান বাতিলের পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত রয়েছে।

এর পক্ষে মত হচ্ছে, পেনশনের শতভাগ সমর্পণ করলে সরকারি চাকরিজীবীরা ভবিষ্যতে অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়েন। কারণ পেনশনের শতভাগ সমর্পণের ফলে একজন অবসরভোগী সরকারি চাকরিজীবীর হাতে এককালীন অনেকগুলো টাকা চলে আসে। এ টাকা দিয়ে তারা বা তাদের পোষ্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করেন। এতে তারা অনেক সময় সব অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে বিগত দিনে অনেক পেনশনভোগী নিঃস্ব হয়েছেন। তাই তাদের মতামত হচ্ছে, শতকরা শতভাগ পেনশন সমর্পণের বিধান বাতিল করা খুবই ভালো সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে, এর বিপক্ষে মতামত হচ্ছে, শতকরা শতভাগ পেনশন সমর্পণের ফলে একজন অবসরভোগীর হাতে অনেকগুলো টাকা একসঙ্গে চলে আসে। এ অর্থ দিয়ে তারা আবাসনখাতে বিনিয়োগসহ আরও জরুরি প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারেন। বিশেষ করে যারা অপেক্ষাকৃত কম বেতন পান তাদের জন্য এ বিধান বাতিল করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে দু’দফায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বৈঠক হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে পেনশন নিয়ে কথা হয়। সে সময় বেশ কয়েকজন সচিব শতভাগ পেনশন সুবিধা সমর্পণ পুনর্বহালের জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।

তাদের যুক্তি হচ্ছে, অনেকে আছেন যাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনই সরকারি চাকরি করেন। পেনশনের আগের সুবিধা বহাল থাকলে স্বামী-স্ত্রী যেকোনো একজন তার পুরো পেনশন সমর্পণ করতে পারতেন। অন্যজন ৫০ ভাগ সমর্পণ আর বাকি ৫০ ভাগের জন্য মাসে মাসে পেনশন সুবিধা গ্রহণ করতে পারতেন। শুধু তাদের ক্ষেত্রেই নয়, অনেক সরকারি চাকরিজীবী অবিবাহিত। কারও আবার সন্তান-সন্ততি নেই। তাদের জন্য বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থা সুবিধাজনক নয়। তাই পেনশনের আগের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হোক।