প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে হামলাকারীকে ছাড়াতে আওয়ামী লীগ নেতার তদবির

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১:৩১:০০ অপরাহ্ণ
0
156
সিলেট প্রতিনিধি:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্য সফরকালে তার গাড়িবহরে হামলা ও বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাওয়ের ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামী প্রবাসী যুবদল নেতা আব্দুল খায়েরকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের কাছে তদবির করেছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে পুলিশ-শফিকুর রহমানের সেই মোবাইল কথোপকথন। অডিওটিতে শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহরে হামলা চালানো যুবককে ছেড়ে দিতে ওসমানীনগর থানার ওসিকে সুপারিশ করতে শোনা যায়। এসময় ওসিকে বারবার বলতে শোনা যায়, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপর হামলার আসামী আমার কিছু করার নেই’।

অডিওটির কথোপকথন নিচে দেওয়া হলো :

ওসি: স্লামালেকুম স্যার ঈদ মোবারক, ভালো আছেন?

শফিকুর রহমান: ঈদ মোবারক ঈদ মোবরক আছি ভালো।

ওসি: জ্বি, স্যার কি আসবেন এলাকাতে আজ

শফিকুর রহমান: না, আইচ্ছা কালকে দুপুরে আমার বাড়িতে আপনার দাওয়াত

ওসি: স্যার আমি স্যার, ছুটিতে যেতে চাচ্ছি

শফিকুর রহমান: ছুটিতে চলে যাবেন….

ওসি: স্যার ইন্সপেক্টর তদন্ত ওসিকে পাঠাবো স্যার?

শফিকুর রহমান: আচ্ছা যেকি রাতে.. তো.. ব্যাপারে… এই যে গতরাতে কাউকে.. লন্ডন প্রবাসী কাইকে এরেস্ট করছেন নাকি?

ওসি: স্যার এরেস্ট…

শফিকুর রহমান: এটা কি বিষয়?

ওসি: কি এটা একটা ওদের আগেরও একটা ঝামেলা ছিলো, তারপর উনি মনে হয় ছাত্রদলের লন্ডন মহানগর যুবদলের সভাপতি, আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন লন্ডনে গেছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহরে ঢিল ছোঁড়ার অভিযোগ ছিলো, ওই ঘটনায় কিছু না। ওই এর কারণে এখানে একটা কামাল আছে। এটাও লন্ডনী একটু ইয়া টাইপের এই কথার প্রতিবাদ করাতে স্যার ওই দিন রাতে পরশু দিনের আগের রাতে একটু হাতাহাতি হয়েছিলো, মারামারিও ছিলো আবার নাকি টাকাটুকাও নিয়ে গেছিলো স্যার। এইগুলা নিয়ে সম্ভবত আইজি স্যারের কাছে কমপ্লিন করেছে এই আরকি

শফিকুর রহমান: কোনটার ব্যাপারে?

ওসি: স্যার পরশু দিনের আগের রাতে দুজনের একটু হাতাহাতি হয়েছিলো

শফিকুর রহমান: দুইজনের হাতাহাতি

ওসি: স্যার মারমারিও হয়েছিলো, স্যার টাকা নিয়ে গেছিলো এটাও বলছিলো স্যার।

শফিকুর রহমান: কার সাথে হইছিলো?

ওসি: আরেক লন্ডনীর সাথে কামাল, ও আবার কালকে লন্ডনে চলে গেছে।

শফিকুর রহমান: কামাল হইলো, আমিতো চিনি ওকে। এ তো খুব ভালো না, সে সবার সাথেই লাগে, সেতো একটা ধান্দাল.. এখন এগুলা একটা নিয়া আমি কি হয়

ওসি: সমস্যা স্যার, এগুলা স্যার আসলেই …হে গিয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইয়াতে যে লন্ডন যাওয়ার পর বিক্ষোভের ছবি, গাড়িতে ঢিল মারছে ছবি এ সকল ফটোকপি কইরা একটা ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি করছে স্যার।

শফিকুর রহমান: এই ছবিগুলো আছে নাকি

ওসি: জ্বি স্যার, হের মোবাইলেও আছে সব ছবি

শফিকুর রহমান: এখন কি করবেন?

ওসি: এখন কি স্থানীয় কয়েকজন বললো আমাকে, আপোষ করা যায় কিনা? আমি বললাম এটা আপনাদের বিষয়। এখন যে স্যার কোর্টের জামিন ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।

শফিকুর রহমান: কোর্টের জামিন ছাড়া উপায় নাই?

ওসি: স্যার আমার কাছে নাই, স্যার পরিবেশটা ঘোলাটে পরিবেশ হয়ে গেছে। স্যার ও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন জায়গায় বোধহয় এটা প্রচার করাইছে, আবার প্রচার করাইয়া ওই সিম রেখে দিছে স্যার।

শফিকুর রহমান: আচ্ছা দেখি, না সে তাই আসছে তার লোকজন, ওর লোকজন সব আজকে আসছে বাসায়, সবাই ওয়েটিং আছে.. অফারে য করবো.. আপনি কয়টার দিকে যাইবেন আজকে?

ওসি: স্যার আমি বিকেলের দিকে যাবো, ঈদের দিন স্যার ঝামেলা থাকে, কোরবানির পরে স্যার কোনো ঝামেলা না হলে বিকেলের দিকে স্যার আশা করি যাবো।

শফিকুর রহমান: আচ্ছা দেখেন, কোনো কিছু যদি থাকে, সাহায্য করা যায় তাকে

ওসি: স্যার

শফিকুর রহমান: সহযোগিতা করা গেলে দেখা করে বা পাঠিয়ে দিবো

ওসি: স্যার

শফিকুর রহমান: যারা আছে তারা আমাদেরই লোক, কালকে তো নাজলু (ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) ও আলাপ করেছিলো

ওসি: জি স্যার নাজলু ভাইও দেখছিলো স্যার পরিবেশটা ঘোলাটে, আমার জন্য টাফ তারপরেও দেখি স্যার আপনি নাজলু ভাই বলছেন যখন, দেখি স্যার কতটুকু হেল্প করা যায়

শফিকুর রহমান: লোক দেখা করবে, দিয়ে আসবে (সমাপ্ত)

এদিকে অডিওটি ভাইরাল হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফেসবুকে আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরীকে তুলোধুনো করতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বেশিরভাগই এঘটনায় শফিকুর রহমানের সাংগঠনিক শাস্তি দাবি করছেন।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্য সফরকালে তার গাড়ি বহরে হামলা ও বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাওয়ের ঘটনায় গত ২১ আগস্ট সিলেটের ওসমানীনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন বৃটেনের ম্যানচেস্টার যুবলীগের সহ-সভাপতি কালাম আহমদ। যার মামলা নম্বর ১৩। মামলায় তিনি লন্ডন মহানগর যুবদলের সভাপতি আব্দুল খায়েরসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করেন; এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজনকে অভিযুক্ত করেন।

আবুল খায়ের (৩৫) উপজেলার উছমানপুর ইউপির রাউৎখাই গ্রামের মো. আব্দুল লতিফের ছেলে। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে বেড়াতে আসলে গত ২১ আগস্ট ওসমানীনগর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসমানীনগর থানার এসআই সাইফুল মোল্লা যুবদল নেতা খায়েরকে গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে হামলা ও বাংলাদেশ দুতাবাস ঘেরাওয়ের অভিযোগে থানায় দায়েরকৃত মামলায় খায়েরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরপর দিন অর্থাৎ ২২ আগস্ট ঈদুল আজহার দিন ওসমানীনগর থানার ওসি আলী মাহমুদকে ফোন করে আসামী খায়েরকে ছেড়ে দিতে তদবির করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান।

এ ব্যাপারে ওসমানীনগর থানার ওসি আলি মাহমুদ বলেন, একটি অডিওর কথা শুনেছি। তবে আমি এখনো শুনিনি সেটা, তাই এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।