প্রচ্ছদ

তার জন্য বসন্ত আসে বিষাদের সুরে

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩:৪১

যুগের কন্ঠ ২৪ ডট কম
হুমায়ুন ফরীদি
::বিনোদন প্রতিবেদক::

ব্যক্তিজীবনটা পুরো সাদামাটা কাটালেও অভিনয়ে অভিনয়ের সবখানেই রাজত্ব করেছেন দুর্দান্ত প্রতাপে। নান্দিনিক অভিনয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন কয়েক দশক। আজ থেকে নয় বছর আগের এই দিনে শহরজুড়ে যখন বসন্তের রঙ ছড়াচ্ছিলো ঠিক সেদিনই এক কিংবদন্তির বিদায়ের খবরে থমকে গিয়েছিলো শহরসহ গোটা দেশ। তিনি আর কেউ নন, হুমায়ুন ফরীদি। আজ তার নবম মৃত্যুবার্ষিকী।

আজ বাদে কালই বসন্ত অর্থাৎ ফাল্গুনের শুরু। শীতের রুক্ষতা ভুলে প্রকৃতি সাজে নতুন রূপে। চারদিকে সবুজের সজীবতায় অপার মুগ্ধতা খেলে যায়। বসন্তের আগমনে এরইমধ্যে শহরের চারদিকে রঙ বেরঙের ছড়াছড়ি শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এতসব রঙের মাঝে নেই একজন হুমায়ুন ফরীদি! যার কারণে শোবিজ অঙ্গনে এই ঋতুরাজ বসন্ত বয়ে আনে এক বিষাদের সুর। মনে করিয়ে দেয় এই অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের প্রয়াণের কথা। তার চলে যাওয়ার শোক এখনও ক্ষত হয়ে আছে প্রতিটি সিনেমাপ্রেমী মানুষের মনে, কবিতাপ্রেমী শ্রোতার কানে, মঞ্চপ্রেমী দর্শকের চোখে। ২০১২ সালের পর থেকে এই দেশের শোবিজপ্রিয় মানুষগুলো বাসন্তী রঙ ভুলে গেছে। হারিয়ে ফেলেছে বর্ণিল উৎসবের মানে।

অভিনয়ের মাধ্যমে আমৃত্যু জীবনের বর্ণীল আলো ছড়িয়েছেন তিনি। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের সবস্তরে তিন দশকের পদার্পণ ছিল তার। তিন ভুবনে অবিস্মরণীয় সাফল্য অর্জন করা হুমায়ুন ফরীদি শুধু একজন অভিনেতাই নন, একাধিক প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে তিনি ‘অভিনয়ের পাঠশালা’।

একবার বর্ষীয়াণ অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘তিনি অনেক বড় মাপের একজন অভিনেতা। তিনি যখন অভিনয় করতেন তখন হাত নাড়তেন, পুরো শরীর দোল দিত। তাঁর পুরো শরীরেই অভিনয় ফুটে উঠতো। তাঁর মত এতো বড় অভিনেতা জীবনে দেখিনি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য যুদ্ধ করেছেন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কখনও পরিচয় দেননি তিনি। তার এ ঋণ কখনো শোধ হবার নয়।’

১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্ম নেওয়া ফরিদী মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তুমুল খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬৪ সালে মাত্র ‪‎বারো‬‬‬‬ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জের মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক ‘ প্রথম অভিনয়ে করেন। যার রক্তে ছিলো অভিনয়, সূর্যের মতো আলো তো তিনি ছড়াবেনই।

ফরীদি অভিনীত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘সংশপ্তক’ (১৯৮৭-৮৮) ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২),‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘বকুলপুর কতদূর’ (১৯৮৫)’, ‘একদিন হঠাৎ’ (১৯৮৬), ‘ও যাত্রা’ (১৯৮৬) ‘মহুয়ার মন’ (১৯৮৬), ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’ (১৯৮৬) ‘পাথর সময়’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’ (১৯৯৩), ‘চন্দ্রগ্রন্থ’ (২০০৬), ‘কাছের মানুষ’ (২০০৬), ‘কোথাও কেউ নাই’ (১৯৯০), ‘মোহনা’ (২০০৬), ‘ভবেরহাট’ (২০০৭), ‘জহুরা’,‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘শৃঙ্খল’ (২০১০), ‘প্রিয়জন নিবাস’ (২০১১), ‘অক্টোপাস’, ‘আরমান ভাই দি জেন্টেলম্যান’ (২০১১)-আরো আরো অনেক নাটকে বিরামহীনভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২), ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩), ‘ভবের হাট’ (২০০৭), ‘শৃঙ্খল’ (২০১০) ইত্যাদি।

নব্বই দশকে এসে নাম লিখিয়েছিলেন বাণিজ্যিক ধারার বাংলা ছবিতে। ‘হুলিয়া’ দিয়ে প্রথম সিনেমাতে অভিনয় করেন। ফরিদী অভিনয়ে এতোটাই অনবদ্য ছিলেন যে একসময় নায়কের চেয়ে বাংলা সিনেমা প্রেমী জাতির কাছে ভিলেন হুমায়ূন ফরিদী বেশি প্রিয় হয়ে ওঠেন। হলে তার সিনেমা মুক্তি মানেই ওপচে পরা ভীড়! সেলুলয়েড়ের বিশাল পর্দায় ফরিদীর উপস্থিতি মানে দর্শকদের মুহুর্মুহু তালি। একটু একটু করে বাংলা সিনেমায় ভিলেনের সংজ্ঞাটাও যেন পরিবর্তন হতে থাকে।

দহন, আনন্দ অশ্রু, বিচার হবে, মায়ের অধিকার, একাত্তরের যীশু, ভন্ড, পালাবি কোথায়, জয়যাত্রা, শ্যামল ছায়া, হিংসা, বিশ্ব প্রেমিক, অপহরণের মতো জনপ্রিয় এবং একই সাথে বানিজ্যিকভাবে সফল ২৫০ টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত অন্যান্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘সন্ত্রাস’, ‘বীরপুরুষ’, ‘দিনমজুর’, ‘লড়াকু’, ‘কন্যাদান’ (১৯৯৫), ‘আঞ্জুমান’ (১৯৯৫), ‘দুর্জয়’ (১৯৯৬), ‘শুধু তুমি’ (১৯৯৭), ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘মিথ্যার মৃত্যু’. ‘বিদ্রোহ চারিদিকে, ‘ব্যাচেলর’ (২০০৪), ‘রূপকথার গল্প’ (২০০৬), ‘আহা!’ (২০০৭), ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

Shares