প্রচ্ছদ

লেখক অভিজিৎ হত্যা: যা ঘটেছিলো সেদিন রাতে

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:২০

যুগের কন্ঠ ২৪ ডট কম
ব্লগার-লেখক অভিজিৎ হত্যা
::নিজস্ব প্রতিবেদক::

প্রায় ছয় বছর আগে দায়ের হওয়া আলোচিত মুক্তমনা ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও একজনের যাবজ্জীবন দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ রায় দেন।

রায়ে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক ওরফে জিয়াসহ পাঁচ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড এবং উগ্রপন্থি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

পদার্থবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ থাকতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি মুক্তমনা ব্লগ সাইট পরিচালনা করতেন তিনি। জঙ্গিদের হুমকির মুখেও তিনি ২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় অংশ নিতে দেশে এসেছিলেন।

সেদিন রাতে যা ঘটেছিলো

বইমেলা শেষ হবার দুই দিন আগে, দিনটি ছিলো ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। সেদিন জমজমাট হয়ে উঠেছে বইমেলা। সেদিন রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে হঠাৎ পেছন থেকে হামলার সম্মুখীন হন ব্লগার, লেখক অভিজিৎ রায়। জঙ্গি কায়দায় হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন এই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তার স্ত্রী।

সেই সময় ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরেই ছিলেন ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদ।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ঘটনা সম্পর্কে তিনি বর্ণনা করেছেন, হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার। আচমকা কাউকে জোরে আঘাত করলে যেরকম চিৎকার করে মানুষ সেরকমই। তখনো আমি বুঝি নাই বড় কিছু ঘটেছে। কিন্তু আমি ঘটনা দেখতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ভেতর থেকে বাইরে আসলাম।‍‍‌‌

কাছে গিয়ে ভীড় ঠেলে দাঁড়াতেই দেখি মাটিতে একজন পড়ে আছে, আরেকজন মহিলা পাশে মোটরসাইকেলের উপর পড়ে আছে। চারদিকে রক্ত। পাশে থেকে মানুষজন বলছে, চাপাতি দিয়া কোপাইছে।

জীবন আহমেদ বলেন, ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।

কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সকল মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো সব। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সাহায্য করার…

আমি প্রথমে মহিলাকে ডাকলাম। তিনবার ডাকার পর তার চেতনা ফেরে। তিনি উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু চেতনা আসতেই যখন তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে ফিরলেন, আমি একটা শক খাইলাম। মুখে-শরীরে-হাতে ভয়াবহভাবে রক্ত লেগে আছে।

জীবন আহমেদ পরে জানতে পেরেছিলেন মহিলার নাম রাফিদা আহমেদ বন্যা।

জীবন আহমেদ জানান, চেতনা ফেরার পর বন্যা প্রথমে বুঝতে পারেননি কী হয়েছে। পরে তাকে জানানো হলে তিনি চিৎকার করে অভিজিতের দিকে ছুটে যান।

এরপর হাসপাতালে নিতে মানুষের সাহায্য চাইতে থাকেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।

পরে জীবন আহমেদই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

অভিজিতের স্ত্রী বন্যা সেদিন গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

জীবন আহমেদ বলেন, রাফিদা আহমেদ বন্যা সিএনজিতে ওঠার পরই সিটে হেলান দেয়া অবস্থায় জ্ঞান হারান। কিছুক্ষণ পরই জ্ঞান ফিরে পান। কিন্তু তখন জীবন আহমেদকে আর চিনতে পারছিলেন না। বরং তাকে হত্যাকারীদের সহযোগী ভাবছিলেন।

জ্ঞান ফিরতেই তিনি খুব উচ্চস্বরে বলতেছিলেন, আপনি কে? এখানে কেন? কী চান? আমি বললাম, আমি আপনাদের মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি। উনি বলতে থাকলেন, আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। আমাদের কেন মারতেছেন? আপনার কত টাকা লাগবে? আমাদের ছেড়ে দেন ইত্যাদি।

জীবন আহমেদ বলেন, এরপরই বন্যা আবারো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

একপর্যায়ে তাদের সিএনজি ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে যায়।

সে রাতে হাসপাতালেই মারা যান অভিজিৎ। গুরুতর আহত তার স্ত্রী বন্যা দীর্ঘ চিকিৎসার পর সেরে ওঠেন।

দেশের ব্লগিং জগতে অভিজিৎ রায় ছিলেন পরিচিত নাম। বিজ্ঞান, নাস্তিকতা এবং ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি একাধিক বইও লিখেছিলেন। এসব বিষয় নিয়ে ‘মুক্তমনা’ নামে একটি কমিউনিটি ব্লগিং প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন তিনি।

সেই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সে বছরই এভাবে মোট পাঁচজন ব্লগার, লেখক কিংবা প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী এসব হামলার দায় শিকার করে।

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পরদিনই তার বাবা অধ্যাপক অজয় রায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছিলেন।

অভিজিৎ ছিলেন আমেরিকান নাগরিক। ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই’র একটি প্রতিনিধি দলও বাংলাদেশ সফর করে। শুরুতে ডিবি পুলিশের হাতে তদন্তকাজ থাকলেও ২০১৭ সালে তদন্তভার পায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। গত ২১ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় ৩৪ জন সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময় ২৮ জন সাক্ষ্য দেন।

চার বছরের তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়। চার্জশিটে ৬ জনকে আসামি করা হয় যাদের মধ্যে দুইজন পলাতক। বাকিরা কারাগারে।

আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণ হলে বিচার শুরু হয় ওই বছরেরই ১ আগস্ট। চলতি বছরের ৪ ফ্রেব্রুয়ারি আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হলে আদালত এটি রায়ের জন্য দিন ধার্য্য করেন।

আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি বহুল আলোচিত ওই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

Shares