রেলপথ ধরে হেঁটে পার হওয়া যাবে পদ্মা সেতু

যুগের কন্ঠ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২০ জুন, ২০২১
  • ২৭
প্রায় প্রস্তুত পদ্মা সেতু। মাওয়া প্রান্ত থেকে তোলা। ছবি সংগৃহীত
::নিজস্ব প্রতিবেদক::

পদ্মা সেতুর রেলপথের স্টেনজার বা গার্ডার বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ স্টেনজারটি বৃহস্পতিবার বসানো হয়। প্রতিটি স্টেনজারের ওপরই রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো হয়েছে। আটটি করে স্ল্যাব বসে প্রতিটি স্টেনজারে। স্প্যানগুলোর মাঝে ফাঁকা স্থানে স্টেনজার বা পাটাতন বসানো হয়। স্প্যানের ওপর বসানো বিয়ারিংয়ের ওপর স্থাপন করা হয় স্টেনজার।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সেতুতে ২ হাজার ৯৫৯টি কংক্রিট স্ল্যাবের মাধ্যমে জোড়া দেয়া হয়েছে। এখন গোটা রেলপথ ধরে হেঁটে মূল সেতু (নদীর অংশ) পার হওয়া যাবে। তবে মূল সেতু থেকে মাটি পর্যন্ত (ঢালু ফ্লাইওভার) পথের কাজ এখনো শেষ হয়নি। আগামী ডিসেম্বরের দিকে সেটা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বসানো হবে রেললাইন।

সেতুটিতে যানবাহন চলাচলের জন্য ২ হাজার ৯১৭টি স্ল্যাব জোড়া দিয়ে পথ তৈরির কথা ছিলো। এই কাজ শেষ হবে আর মাত্র ২২৮টি স্ল্যাব জোড়া দিলেই।

এদিকে যানবাহন চলাচলের পথে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে মূল সেতু থেকে মাটি পর্যন্ত উড়ালপথ শেষ হয়েছে। আগামী মাসে শেষ হবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত। সব মিলিয়ে মাওয়া থেকে জাজিরা পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের পথে হেঁটে পার হওয়া যাবে সেপ্টেম্বরে।

পদ্মা সেতুর সর্বশেষ অগ্রগতির প্রতিবেদনে এ কথা তুলে ধরা হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী জুনে সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হবে। একই দিন ট্রেন চালুরও লক্ষ্য আছে।

তারা আরো বলছেন, শ্রমিকদের ছুটি দিলে কাজ পিছিয়ে পড়বে। জুন মাসে সেতু উদ্বোধন করা যাবে না। গত ঈদের দিনও তারা আট ঘণ্টা কাজ করেছেন। কর্মকর্তারাও কেউ ছুটি নেন না।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের অধীনে মূল সেতুতে রেলপথ এবং সেতুর দুই প্রান্তে ৫৩২ মিটার উড়ালপথ তৈরি করছে সেতু বিভাগ। অন্যদিকে সেতু ও এর দুই প্রান্ত রেললাইন বসানোর দায়িত্ব রেলপথ মন্ত্রণালয়ের। এজন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

পুরো প্রকল্পের কাজ তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা থেকে মাওয়া, মাওয়া থেকে ভাঙ্গা এবং ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ। এর মধ্যে সেতু উদ্বোধনের দিন মাওয়া থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চালুর অগ্রাধিকার ঠিক করেছে রেলওয়ে। এই অংশের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার, কাজ এগিয়েছে ৭৭ শতাংশ।

মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি

পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। দুই প্রান্তের ভায়াডাক্ট অর্থাৎ সংযোগ সেতুর দৈর্ঘ্য ৩.৬৭ কিলোমিটার। অর্থাৎ সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৯.৮২ কিলোমিটার। সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত মিশেছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায়। উত্তর প্রান্তে সেতু শুরু হয়েছে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া এলাকা থেকে। গত ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর সর্বশেষ বা ৪১তম স্টিলের স্প্যান জোড়া দেয়ার মাধ্যমে মূল সেতুর পুরোটা দৃশ্যমান হয়। দ্বিতলবিশিষ্ট পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন আর ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন।

মূল সেতুকে মাটির সঙ্গে যুক্ত করার জন্য দুই প্রান্তে রয়েছে ভায়াডাক্ট। দুই প্রান্তে দুই ভাগ হয়ে এই ভায়াডাক্ট মিশেছে সংযোগ সড়কের সঙ্গে। একটি ভায়াডাক্ট দিয়ে যানবাহন মূল সেতুতে উঠবে এবং অন্যটি দিয়ে নেমে যাবে। দুই প্রান্তে সড়ক সেতুর দুটি ভায়াডাক্টের মাঝখান দিয়ে ট্রেন মূল সেতুতে ওঠা-নামার জন্য থাকবে আরেকটি ভায়াডাক্ট।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল সেতুর কাঠামো তৈরি করতে মোট ৪১টি ট্রাস বা স্প্যান ব্যবহৃত হয়েছে। এই স্প্যানের ওপর দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাব বসানো হবে। বাকি আছে ২২৮টি স্ল্যাব। পাঁচ হাজার ৮৩৪টি শেয়ার পকেটের মধ্যে বাকি রয়েছে ৮১২টি। মূল সেতু ও ভায়াডক্ট মিলে রোডওয়েতে মোট ১২ হাজার ৩৯০টি প্যারাপেট ওয়াল বা রেলিং বসানো হবে। এর মধ্যে এক হাজার ৮৯১টি বসানো হয়েছে। অর্থাৎ বাকি আছে ৮৫ শতাংশ কাজ। রোডওয়েতে পানি নিরোধক একটি স্তর (ওয়াটার প্রুফ মেমব্রেন) বসানো হবে। এর ওপর সিমেন্ট ও পিচ ঢালাই হবে। পানি নিরোধন স্তর স্থাপনের কাজ এখনো শুরু হয়নি। সেতুর নিরাপত্তা এলাকায় এই স্তর বসানোর পরীক্ষামূলক কাজ করে তা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে এই স্তর বসানোর কাজ শুরু হবে।

এখনো সড়কে বাতি লাগানোর কাজ শুরু হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কাজও বাকি আছে। পদ্মা সেতুতে ৫০০ কেভিএ বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। সেতুতে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য জাজিরা ও মাওয়া প্রান্তে দুটি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে ওই সাবস্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

পদ্মা সেতুতে প্রতিদিন কত টাকার বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে এমন প্রশ্নে কর্মকর্তা জানান, এখনো সে হিসাব চূড়ান্ত করা হয়নি। সেতুতে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ ইজারা দেওয়া হবে। ইজারা পাওয়া প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও আনুষঙ্গিক কাজের দায়িত্ব পালন করবে। সেতুর ওপর গ্যাস লাইন বসানোর কাজ চলছে।

পদ্মা সেতু বহুমুখী প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, কর্মপরিকল্পনা অনুসারে আগামী বছর ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সেতুর বিদ্যুৎ সংযোগ ও বাতি লাগানোর কাজ সম্পন্ন সম্ভব হবে। রেলিংসহ অন্যান্য যে কাজ বাকি রয়েছে সেগুলো আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে এবং জুনের মধ্যে সেতুর কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ হয়ে যাবে। জুন মাসেই পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া সম্ভব হবে।

তবে সেতুতে কর্মরত একাধিক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, আশা করা যায় আগামী বছর মার্চ মাসে অর্থাৎ ঘোষিত জুন মাসের দুই মাস আগেই পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।

পদ্মা সেতু সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার একটি বৃহৎ প্রকল্প। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ১ জুন পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার ২৬০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..