মুদি দোকানি থেকে মানবপাচারকারীর মূলহোতা

নিজস্ব প্রতিবেদক;
  • প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৬ দিন আগে
ছবি সংগৃহীত

এইচএসসি পাস সাইফুল ইসলাম ওরফে টুটুল গ্রামে মুদি দোকানদারি করতেন। অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার লোভে ধীরে ধীরে মানবপাচারকারী কোনও একটি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। শুরু করেন চক্রের দালাল হিসেবে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ। এরপর নিজেই রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় ‘টুটুল ওভারসিজ, লিমন ওভারসিজ ও লয়াল ওভারসিজ’ নামে ৩টি এজেন্সি অফিস খুলে বনে যান মানবপাচারকারীদের প্রধান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার ও শিক্ষিত বহু নারী-পুরুষকে উচ্চ বেতনে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে হাতিয়ে নেন টুটুল কোটি টাকা। এভাবেই টাকা হাতিয়ে নিয়ে কাজ না দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল একটি চক্র।

মঙ্গলবার রাত থেকে আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বাড্ডায় অভিযান চালিয়ে চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলামসহ (টুটুল) ও সহযোগী তৈয়বসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

গ্রেপ্তাররা হলেন- তৈয়ব আলী (৪৫), শাহ্ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন লিমন (৩৮), মো. মারুফ হাসান (৩৭), মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৮), মো. লালটু ইসলাম (২৮), মো. আলামিন হোসাইন (৩০) ও মো. আব্দল্লাহ আল মামুন (৫৪)।

অভিযানে ৪ জন ভিকটিমসহ, ১০টি পাসপোর্ট, ৭টি ফাইল, ৪টি সিল, ১৭টি মোবাইল, ৫টি রেজিস্টার, মোবাইল সিম ৩টি, ৪টি ব্যাংকের চেক বই, ২টি কম্পিউটার, ৩টি লিফলেট এবং নগদ ১০ হাজার ৭০ টাকা জব্দ করা হয়।

র‌্যাব বলছে, টুটুলের এই প্রতারণার কাজে অন্যতম সহযোগী আবু তৈয়ব ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। মেহেরপুরের গাংনী থানার কামন্দী গ্রামে মুদিদোকানি টুটুল কয়েক বছর আগে মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসতেন। অল্প সময়ে ধনী হওয়ার লোভে ধীরে ধীরে মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। চক্রের দালাল হিসেবে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করতেন তৈয়ব। মূলত টুটুলের প্ররোচনায় মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বহু লোককে প্রতারণামূলকভাবে বিদেশে পাঠানো এবং দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়ার নামে টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তৈয়ব নিজেকে দেশের একটি স্বনামধন্য এয়ারলাইন্সের ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিতেন। এভাবে বিভিন্ন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে চাকরি এবং দেশের নামীদামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি দেয়ার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। প্রাথমিক জিঙ্গাসাবাদে গ্রেপ্তাররা এখন পর্যন্ত ৫০ জনকে পাচারের কথা জানিয়েছেন।

বুধবার দুপুরে কারওরানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক এসব তথ্য জানান।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার বাকিরা মাঠ পর্যায়ে টার্গেট সংগ্রহ, প্রার্থীর পাসপোর্টের ব্যবস্থা, কথিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, টাকা সংগ্রহ, প্রাথমিক মেডিক্যাল সম্পূর্ণ করাসহ অন্যান্য কাজে সহায়তা করতেন। টুটুল ও তৈয়বের নির্দেশে এই চক্র মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করতো। তাদের কয়েকটি টিম দেশজুড়ে কাজ করে।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, এরা অনেকগুলো ধাপে কাজ করে। প্রথমত এই পাচারকারী চক্রের কিছু সদস্য দেশের বেকার ও অসচ্ছল যুবক-যুবতীদের সৌদি আরব, জর্ডান ও লেবাননসহ বিভিন্ন দেশের বাসাবাড়িতে লোভনীয় বেতনে কাজ দেওয়ার নাম করে রাজি করিয়ে ঢাকায় টুটুল ও তৈয়বের কাছে নিয়ে আসে।

এরপর টুটুল ও তৈয়ব তাদের অফিসে সংগ্রহীত ভিকটিমদের বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশে ভুয়া মানিরিসিপ্ট প্রদান করে প্রত্যেকের কাছ থেকে ২-৫ লাখ টাকা করে নিতেন।

কথিত প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারণার উদ্দেশে এই পাচারকারী চক্রের কয়েকজন সদস্য নিজেদেরকে উচ্চশিক্ষিত বলে পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ভিকটিমদের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বাসাবাড়িতে কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভিকটিমদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আদায় করতো।

তিনি বলেন, এই পাচারকারী চক্রের কয়েকজন সদস্য অফিস স্টাফ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতো। এতে করে তাদের মনে আর কোনও সন্দেহ থাকতো না। এই চক্রের কিছু সদস্য পাসপোর্ট অফিসের দালালদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তাদের পাসপোর্ট তৈরি করে দিতো। এই চক্রের মূলহোতা টুটুল ও তৈয়বের নির্দেশে নারী পরুষদের বিদেশে যাওয়ার জন্য লোক দেখানো মেডিক্যাল সম্পন্ন করা হতো।

র‌্যাব জানায়, সকল প্রক্রিয়া শেষ করে কয়েকজনকে বিদেশে পাঠিয়ে বাসাবাড়িতে কাজের কথা বলে বিশেষ করে নারীদের বিক্রি এবং পুরুষদের অমানবিক কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশে সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদ, জর্ডান ও লেবাননে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হতো।

এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, বিদেশে পাচারকৃত ভিকটিমরা বিদেশে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করতে পারতেন না। চক্রটি যাদেরকে বিদেশে পাঠাতে পারতো না তারা টাকা ফেরতের আশায় অফিসে যোগাযোগ করলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা না দিয়ে আত্মসাৎ করে আসছিল।

র‌্যাব-৪ এর কাছে গাইবান্ধার মো. আশরাফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার ভাতিজি আসমা বেগম তৈয়ব ও টুটুলের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়ে গত ৯ জুন জর্ডান যায়। তাকে বাসাবাড়িতে কাজের কথা বলে পাঠানো হলেও সে পাচার হয়েছে বলে তারা আশঙ্কা করেন। যাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ যোগাযোগ থাকলেও এখন আসমার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরকম বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষকে প্রতারণামূলকভাবে সৌদি আরবে পাঠিয়ে বিক্রি করেছে বলে র‌্যাব-৪ এর কাছে অভিযোগ করেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত তিনি ৫০ জনকে মানবপাচার কথা জানিয়েছেন। ২৫ জন ভুক্তভোগী র‍্যাবের কাছে ইতিমধ্যে অভিযোগ জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ভিকটিম মোরশেদা বেগম (৩৪), মোছা. হামিদা আক্তার (৩২), মোরশেদা বিবি (৩২) এবং মালেকা বেগম (৫১) একই উপায়ে তৈয়বের কাছে বিদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র জমা দেন। এর মধ্যে মোরশেদা ও হামিদাকে অভিযানকালে টুটুলের অফিস থেকে উদ্ধার করা হয়। এরা প্রতারণার শিকার হয়ে দুই বছরের অধিক সময় তৈয়ব ও টুটুলের অফিসে ঘোরাফেরা করেছেন। তারা র‌্যাব-৪ এ প্রতারণা ও পাচার সংক্রান্ত তথ্য দেন। এমন আরও ২০-২৫ জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই কোম্পানির সকল কার্যক্রম অবৈধ। এ ছাড়া টুটুল ওভারসিজ, লিমন ওভারসিজ ও লয়াল ওভারসিজ নামক প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত নয়। এমনকি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কোনও অফিশিয়াল সাইনবোর্ডও নেই। কোম্পানি থেকে সরকারি কোনও ভ্যাট/ট্যাক্স প্রদান করা হয় না।

কত বছর যাবত টুটুল এই কাজের সঙ্গে জড়িত জানতে চাইলে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ৫-৬ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন।

মানবপাচারকারীরা কোন পথে পাচার করতে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা বিমান পথেই পাচার করতো।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...