ঢাকা ০৬:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পাল্টানো সময়ে পাল্টে যাওয়া গজলিয়া মেসবাহ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট : ১১:৫৭:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমাবার, ৩০ অগাস্ট ২০২১
  • / 125
কাব্য আর সুরের যুথবন্ধনে এ উপমহাদেশে ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিকশিত ধারা গজল। সেই চতুদর্শ শতক থেকে অভিজাত ঘরানার সঙ্গীত হিসেবে গজল চর্চিত হয়ে আসছে। আমির খসরু, ওমর খৈয়াম আর মির্জা গালিবের পথ ধরে মেহেদি হাসান, নূরজাহান, জগজিৎ সিং, নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো মনীষীরা আভিজাত্যের ঘেরাটোপ ভেঙে গজলকে পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের আঙিনায়।গজলের সেই জয়রথ আজ কতোটা সচল, নাকি কালের ধূলোয় সীমিত গন্ডিতে বন্দি হয়ে পড়েছে ঐতিহ্যের এই ধারা?

গজলে কালের ধূলো জমেছে, এ কথা মানতে নারাজ মেসবাহ আহমেদ। ‘গজলিয়া’ খ্যাত এই গায়কের দাবি গজল তার সঠিক যাত্রাপথেই আছে। তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে শৈল্পিক ঘরানা সঙ্গীত হলো গজল। কবে কোনকালে কোথায় পথেঘাটে গজল গাওয়া হয়েছে কেউ কি বলতে পারবেন! সব শ্রেণির শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেলেও গজলের প্রকৃত সমঝদার হলো শিল্পবোধ সম্পন্ন রুচিশীল মানুষেরা। গজল শোনার বিষয় নয়, এতে বোঝারও অনেক ব্যাপার আছে। যাদের সেই জ্ঞান-বুদ্ধি-রুচি আছে, তাদের কাছে গজলের আবেদন ফুরোবে না কখনোই। সবাই কি সাহিত্য বা কবিতা বুঝে? তাই বলে সাহিত্য বা কাব্যচর্চা থেমে নেই। এটা গজলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

গজলের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী এ সঙ্গীতশিল্পী বলেন, গজল তো চাইলেই সবাই গাইতে পারে না। গজল গাওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়তে হয়। আশার কথা হলো, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেয়া নতুন প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়েই এখন গজলের চর্চা করছে। তাছাড়া আমরা যারা নিয়মিত গজল করছি তাঁদের অনেককেই দেশ-বিদেশের শ্রোতারা ভালোবেসে গ্রহণ করেছেন। আমার কথা বলতে পারি। দেশের শ্রোতাদের পাশাপাশি দেশের বাইরের শ্রোতাদেরকেও গান শোনাতে ছুটতে হচ্ছে আমাকে। ভারতের একাধিক টেলিভিশনে গজল পরিবেশনের জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি গেয়েছি। সেখানকার শ্রোতারা ভালোবেসে আমার গজল গ্রহণ করেছেন। এখন নিয়মিত তারা আমাকে চাচ্ছেন। ভারতের বাইরে ইউরোপ-অ্যামেরিকাতেও গজল শোনাতে ছুটতে হচ্ছে আমাকে। গজলে আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলেই মনে করি।

দেশবরেণ্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ নিয়াজ মুহাম্মদ চৌধুরীর শিষ্য মেসবাহ আহমেদ। পেয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গজলগায়ক জগজিৎ সিংয়ের সান্নিধ্য। সেই শৈশবে তালিম নিয়েছেন ধ্রুপদী গানে। রাজধানীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মেসবাহ ভাসেননি গড্ডালিকা প্রবাহে। গজলকে অবলম্বন করে একটু একটু করে গড়েছেন ক্যারিয়ার। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শিল্পী পৌঁছে দিচ্ছেন শ্রোতা-দর্শকদের কাছে। গজল ছাড়াও অন্যঘরানার গানে কণ্ঠ দিলেও সেগুলোতে শাস্ত্রীয় সুরের প্রাধান্য লক্ষণীয়। নিজেই কথা লিখেছেন, নিজেই সুর আর কণ্ঠ দিয়েছেন বেশকিছু গানে। স্টেজ শো আর টিভির মিউজিক শোতে নিয়মিত অংশ নিলেও জনপ্রিয়তা মোহে আচ্ছন্ন হননি কখনোই।

হঠাৎ এসে ঝলসে ওঠা গায়ক-গায়িকাদের তুমুল জনপ্রিয়তায় কখনো কী ঈর্ষান্বিত হয়েছেন? মনের কোনে কখনো কি হতাশা ছায়া ফেলেছে? জবাবে মেসবাহ আহমেদ বললেন, যিনি হঠাৎ এসে দু’চারটা গান গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান; তাকে আমি খাঁটো করে দেখি না। নিশ্চয়ই তার মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাকে লাইমলাইটে এনেছে। যদিও হঠাৎ ক্রেজ তৈরি করা গায়ক-গায়িকারা যেভাবে আসেন সেভাবেই হারিয়ে যেতে বেশি দেখা গেছে। নামের সুনাম তারা ধরে রাখতে পারেন না। তাদের দেখে কেন আমি ঈর্ষান্বিত হবো ? জনপ্রিয়তার পথে তো কখনোই অমি হাঁটতে চাইনি। কারো জনপ্রিয়তা দেখে হতাশ হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।গান গেয়ে জনপ্রিয়তা পেতে হবে, এ ধরনের ভাবনা আমাকে প্রভাবিত করে না কখনোই। নিজের অবস্থান নিয়েও আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। গান আমার আত্মার খোরাক। আত্মাকে বিশুদ্ধ খোরাক দিতে পারাটাই বড় করে দেখি। গানকে অবলম্বন করে জীবন সাজাইনি। বরং জীবনের প্রয়োজনেই গান গেয়ে যাই। জীবনের শেষ দিনেরও গান গেয়ে দিতে চাই।

গানকে জীবিকা হিসেবে নিতে চাইলে অসুবিধা কী- জানতে চাইলে মেসবাহ বলেন, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। একটা সময় হয়তো প্লেব্যাক বা অডিও সেক্টরকে অবলম্বন করে আমাদের অগ্রজরা গানকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছিলেন। এখন তো ফিল্ম বা অডিও ইন্ডাষ্ট্রিকে দুরবীন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেবল স্টেজ শো আর দু’চারটা টিভি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে পাওয়া সম্মানীতে জীবন চালানো যায় না। ঘরে অভাব আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে ভালো গান অসম্ভব। এই করোনাকালে কতো শিল্পী আর মিউজিশিয়ান যে কি নিদারুণ জীবনযাপন করছেন, কেউ তাদের খবর নেয় না। শিল্পীদের এথন জীবিকার জন্য অন্যকোনো পেশাকে অবলম্বন করতে হবে, গান হতে পারে বড়জোর সাইড প্রফেশন।

সঙ্গীতে উত্তরাধিকার বলে কিছু একটা আছে। শিল্পী মাহমুদুন্নবীর তিন সন্তান ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী আর পঞ্চম পিতার দেখানো পথেই হেঁটেছেন। খান আতাউর রহমানের পুত্র আগুন কিংবা ফেরদৌস আহমেদের ছেলে হাবিবের গানে হাতেখড়ি বাবার কাছেই। কিন্তু আজকাল অনেক শিল্পীর মধ্যেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গানের জগতে আনতে অনীহা আছে। এর নেপথ্যে অনিশ্চয়তাকেই দায়ি করলেন মেসবাহ আহমেদ। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সিংহভাগ শিল্পীকেই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে প্লাটফর্মে ওঠে আসতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে সেই অনিশ্চয়তা ঠেলে দিতে চান না বাস্তববাদী বহু শিল্পীই। তবে শিল্পীর পরিবারের কেউ না কেউ ঠিকই গানের মধ্যে থাকেন, অন্তত ঘরোয় চর্চায় তাদের খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া আজকাল সন্তানদের মতো বাবা-মায়েরাও যখেষ্ট স্মার্ট। তারা ছেলেমেয়েদের আগ্রহ আর ঝোঁককে গুরুত্ব দিতে জানে। যেমন:আমার ছেলে খেলতে ভালোবাসে। আমি তাকে খেলতে দেই। জোর করে তাকে গানে বসানোর চেয়ে তাকে খেলার মাঠে ছেড়ে দেয়াটাই ভালো মনে করি। হয়তো সেখানেই সে জ্বলে ওঠতে পারে। আবার আমার মেয়ের মিউজিকের প্রতি আকর্ষণ আছে। তার আগ্রহকে আমি উৎসাহিত করছি। সে মিউজিকের স্কুলে যাচ্ছে, পিয়ানো শিখছে।

একটা সময় মেসবাহ আহমেদ গজল গাওয়ার পাশাপাশি নিজের লেখা ও সুরের বাইরে গান করতেন না। ওই জায়গা থেকে তিনি সরে এসেছেন। এখন অন্যদের লেখা ও সুরের গান তিনি নিজে গাইছেন, আবার নিজের কথা-সুরের গান অন্যদের গাযতেও দিচ্ছেন। মিউজি ক কম্পোজিশনের কাজও করেছেন বেশ কয়েকটি। এ বিষয়ে মেসবাহ বলেন, বয়স বাড়ছে। উপলব্ধি করছি, নিজেকে আরও ছড়িয়ে দিতে হবে। আমার লেখা ও সুরের গান শুধু আমি কেন গাইবো? অন্য শিল্পীরাও গাক, কিছু গান গেয়েছেও।আসলে জীবনের সময় দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যায়। এরই মধ্যে কিছু ভালো কাজ করতে হবে, ভালো কাজ রেখে যেতে হবে। শ্রদ্ধেয় আলাউদ্দিন আলী আর লাকী আখন্দ চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন আসাধারণ কিছু কাজ, যে গানগুলোর মধ্যে তারা বেঁচে আছেন। তাদের কাজই এখন আমাকে প্রতিমুহূর্তে তাগিদ দেয় ভালো কিছু করার। যোগ্য ও আগ্রহীদের জন্য আমার দরোজা খুলে দিয়েছি, কেউ যদি আমার লেখা-সুরে বা কম্পোজিশনে গান করতে চান, সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে চাই।

তিনি বলেন, আগে গজলের বাইরে নিজের লেখা-সুরের গানে কণ্ঠ দেয়া ছাড়া খুব বেশি কাজ করা হয়নি। কিছু গুণী মানুষের আগ্রহে ও অনুপ্রেরণায় তাদের সঙ্গে কাজ করছি। অনেকেই বলেন, সঙ্গীত একধরনের যৌথশিল্প; একাধিক সৃজনশীল মানুষের মেধা ও শ্রমে সৃষ্টি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। ভালো যে কোনো কিছুর সঙ্গেই নিজেকে জড়াতে চাই। সেই কমিটমেন্ট থেকে সাম্প্রতিক সময়ে রূপকথা প্রডাকশনের এনামুল কবীর সুজনের এবং গীতিকার গোলাম মোরশেদের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বলে জানালেন মেসবাহ আহমেদ।

গজলের বিশাল পরিসরের মধ্যে থেকেও গত এক বছরে নতুন চারটা গান করেছেন ধ্রুপদীধারা এই শিল্পী। যার মধ্যে গানবাংলার তাপসের অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি ‘তিনি চাইলেই বাগানে বসন্ত আসে’ আর ‘বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে’ গান দুটো এরই মধ্যেই সমাদৃত হয়েছে। এসব গানের অডিও ভার্সনের কাজ চলছে, শিগগিরই তা রিলিজ পাবো বলে জানালেন মেসবাহ আহমেদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

পাল্টানো সময়ে পাল্টে যাওয়া গজলিয়া মেসবাহ

আপডেট : ১১:৫৭:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমাবার, ৩০ অগাস্ট ২০২১
কাব্য আর সুরের যুথবন্ধনে এ উপমহাদেশে ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিকশিত ধারা গজল। সেই চতুদর্শ শতক থেকে অভিজাত ঘরানার সঙ্গীত হিসেবে গজল চর্চিত হয়ে আসছে। আমির খসরু, ওমর খৈয়াম আর মির্জা গালিবের পথ ধরে মেহেদি হাসান, নূরজাহান, জগজিৎ সিং, নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো মনীষীরা আভিজাত্যের ঘেরাটোপ ভেঙে গজলকে পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের আঙিনায়।গজলের সেই জয়রথ আজ কতোটা সচল, নাকি কালের ধূলোয় সীমিত গন্ডিতে বন্দি হয়ে পড়েছে ঐতিহ্যের এই ধারা?

গজলে কালের ধূলো জমেছে, এ কথা মানতে নারাজ মেসবাহ আহমেদ। ‘গজলিয়া’ খ্যাত এই গায়কের দাবি গজল তার সঠিক যাত্রাপথেই আছে। তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে শৈল্পিক ঘরানা সঙ্গীত হলো গজল। কবে কোনকালে কোথায় পথেঘাটে গজল গাওয়া হয়েছে কেউ কি বলতে পারবেন! সব শ্রেণির শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেলেও গজলের প্রকৃত সমঝদার হলো শিল্পবোধ সম্পন্ন রুচিশীল মানুষেরা। গজল শোনার বিষয় নয়, এতে বোঝারও অনেক ব্যাপার আছে। যাদের সেই জ্ঞান-বুদ্ধি-রুচি আছে, তাদের কাছে গজলের আবেদন ফুরোবে না কখনোই। সবাই কি সাহিত্য বা কবিতা বুঝে? তাই বলে সাহিত্য বা কাব্যচর্চা থেমে নেই। এটা গজলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

গজলের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী এ সঙ্গীতশিল্পী বলেন, গজল তো চাইলেই সবাই গাইতে পারে না। গজল গাওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়তে হয়। আশার কথা হলো, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেয়া নতুন প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়েই এখন গজলের চর্চা করছে। তাছাড়া আমরা যারা নিয়মিত গজল করছি তাঁদের অনেককেই দেশ-বিদেশের শ্রোতারা ভালোবেসে গ্রহণ করেছেন। আমার কথা বলতে পারি। দেশের শ্রোতাদের পাশাপাশি দেশের বাইরের শ্রোতাদেরকেও গান শোনাতে ছুটতে হচ্ছে আমাকে। ভারতের একাধিক টেলিভিশনে গজল পরিবেশনের জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি গেয়েছি। সেখানকার শ্রোতারা ভালোবেসে আমার গজল গ্রহণ করেছেন। এখন নিয়মিত তারা আমাকে চাচ্ছেন। ভারতের বাইরে ইউরোপ-অ্যামেরিকাতেও গজল শোনাতে ছুটতে হচ্ছে আমাকে। গজলে আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলেই মনে করি।

দেশবরেণ্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ নিয়াজ মুহাম্মদ চৌধুরীর শিষ্য মেসবাহ আহমেদ। পেয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গজলগায়ক জগজিৎ সিংয়ের সান্নিধ্য। সেই শৈশবে তালিম নিয়েছেন ধ্রুপদী গানে। রাজধানীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মেসবাহ ভাসেননি গড্ডালিকা প্রবাহে। গজলকে অবলম্বন করে একটু একটু করে গড়েছেন ক্যারিয়ার। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শিল্পী পৌঁছে দিচ্ছেন শ্রোতা-দর্শকদের কাছে। গজল ছাড়াও অন্যঘরানার গানে কণ্ঠ দিলেও সেগুলোতে শাস্ত্রীয় সুরের প্রাধান্য লক্ষণীয়। নিজেই কথা লিখেছেন, নিজেই সুর আর কণ্ঠ দিয়েছেন বেশকিছু গানে। স্টেজ শো আর টিভির মিউজিক শোতে নিয়মিত অংশ নিলেও জনপ্রিয়তা মোহে আচ্ছন্ন হননি কখনোই।

হঠাৎ এসে ঝলসে ওঠা গায়ক-গায়িকাদের তুমুল জনপ্রিয়তায় কখনো কী ঈর্ষান্বিত হয়েছেন? মনের কোনে কখনো কি হতাশা ছায়া ফেলেছে? জবাবে মেসবাহ আহমেদ বললেন, যিনি হঠাৎ এসে দু’চারটা গান গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান; তাকে আমি খাঁটো করে দেখি না। নিশ্চয়ই তার মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাকে লাইমলাইটে এনেছে। যদিও হঠাৎ ক্রেজ তৈরি করা গায়ক-গায়িকারা যেভাবে আসেন সেভাবেই হারিয়ে যেতে বেশি দেখা গেছে। নামের সুনাম তারা ধরে রাখতে পারেন না। তাদের দেখে কেন আমি ঈর্ষান্বিত হবো ? জনপ্রিয়তার পথে তো কখনোই অমি হাঁটতে চাইনি। কারো জনপ্রিয়তা দেখে হতাশ হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।গান গেয়ে জনপ্রিয়তা পেতে হবে, এ ধরনের ভাবনা আমাকে প্রভাবিত করে না কখনোই। নিজের অবস্থান নিয়েও আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। গান আমার আত্মার খোরাক। আত্মাকে বিশুদ্ধ খোরাক দিতে পারাটাই বড় করে দেখি। গানকে অবলম্বন করে জীবন সাজাইনি। বরং জীবনের প্রয়োজনেই গান গেয়ে যাই। জীবনের শেষ দিনেরও গান গেয়ে দিতে চাই।

গানকে জীবিকা হিসেবে নিতে চাইলে অসুবিধা কী- জানতে চাইলে মেসবাহ বলেন, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। একটা সময় হয়তো প্লেব্যাক বা অডিও সেক্টরকে অবলম্বন করে আমাদের অগ্রজরা গানকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছিলেন। এখন তো ফিল্ম বা অডিও ইন্ডাষ্ট্রিকে দুরবীন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেবল স্টেজ শো আর দু’চারটা টিভি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে পাওয়া সম্মানীতে জীবন চালানো যায় না। ঘরে অভাব আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে ভালো গান অসম্ভব। এই করোনাকালে কতো শিল্পী আর মিউজিশিয়ান যে কি নিদারুণ জীবনযাপন করছেন, কেউ তাদের খবর নেয় না। শিল্পীদের এথন জীবিকার জন্য অন্যকোনো পেশাকে অবলম্বন করতে হবে, গান হতে পারে বড়জোর সাইড প্রফেশন।

সঙ্গীতে উত্তরাধিকার বলে কিছু একটা আছে। শিল্পী মাহমুদুন্নবীর তিন সন্তান ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী আর পঞ্চম পিতার দেখানো পথেই হেঁটেছেন। খান আতাউর রহমানের পুত্র আগুন কিংবা ফেরদৌস আহমেদের ছেলে হাবিবের গানে হাতেখড়ি বাবার কাছেই। কিন্তু আজকাল অনেক শিল্পীর মধ্যেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গানের জগতে আনতে অনীহা আছে। এর নেপথ্যে অনিশ্চয়তাকেই দায়ি করলেন মেসবাহ আহমেদ। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সিংহভাগ শিল্পীকেই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে প্লাটফর্মে ওঠে আসতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে সেই অনিশ্চয়তা ঠেলে দিতে চান না বাস্তববাদী বহু শিল্পীই। তবে শিল্পীর পরিবারের কেউ না কেউ ঠিকই গানের মধ্যে থাকেন, অন্তত ঘরোয় চর্চায় তাদের খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া আজকাল সন্তানদের মতো বাবা-মায়েরাও যখেষ্ট স্মার্ট। তারা ছেলেমেয়েদের আগ্রহ আর ঝোঁককে গুরুত্ব দিতে জানে। যেমন:আমার ছেলে খেলতে ভালোবাসে। আমি তাকে খেলতে দেই। জোর করে তাকে গানে বসানোর চেয়ে তাকে খেলার মাঠে ছেড়ে দেয়াটাই ভালো মনে করি। হয়তো সেখানেই সে জ্বলে ওঠতে পারে। আবার আমার মেয়ের মিউজিকের প্রতি আকর্ষণ আছে। তার আগ্রহকে আমি উৎসাহিত করছি। সে মিউজিকের স্কুলে যাচ্ছে, পিয়ানো শিখছে।

একটা সময় মেসবাহ আহমেদ গজল গাওয়ার পাশাপাশি নিজের লেখা ও সুরের বাইরে গান করতেন না। ওই জায়গা থেকে তিনি সরে এসেছেন। এখন অন্যদের লেখা ও সুরের গান তিনি নিজে গাইছেন, আবার নিজের কথা-সুরের গান অন্যদের গাযতেও দিচ্ছেন। মিউজি ক কম্পোজিশনের কাজও করেছেন বেশ কয়েকটি। এ বিষয়ে মেসবাহ বলেন, বয়স বাড়ছে। উপলব্ধি করছি, নিজেকে আরও ছড়িয়ে দিতে হবে। আমার লেখা ও সুরের গান শুধু আমি কেন গাইবো? অন্য শিল্পীরাও গাক, কিছু গান গেয়েছেও।আসলে জীবনের সময় দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যায়। এরই মধ্যে কিছু ভালো কাজ করতে হবে, ভালো কাজ রেখে যেতে হবে। শ্রদ্ধেয় আলাউদ্দিন আলী আর লাকী আখন্দ চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন আসাধারণ কিছু কাজ, যে গানগুলোর মধ্যে তারা বেঁচে আছেন। তাদের কাজই এখন আমাকে প্রতিমুহূর্তে তাগিদ দেয় ভালো কিছু করার। যোগ্য ও আগ্রহীদের জন্য আমার দরোজা খুলে দিয়েছি, কেউ যদি আমার লেখা-সুরে বা কম্পোজিশনে গান করতে চান, সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে চাই।

তিনি বলেন, আগে গজলের বাইরে নিজের লেখা-সুরের গানে কণ্ঠ দেয়া ছাড়া খুব বেশি কাজ করা হয়নি। কিছু গুণী মানুষের আগ্রহে ও অনুপ্রেরণায় তাদের সঙ্গে কাজ করছি। অনেকেই বলেন, সঙ্গীত একধরনের যৌথশিল্প; একাধিক সৃজনশীল মানুষের মেধা ও শ্রমে সৃষ্টি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। ভালো যে কোনো কিছুর সঙ্গেই নিজেকে জড়াতে চাই। সেই কমিটমেন্ট থেকে সাম্প্রতিক সময়ে রূপকথা প্রডাকশনের এনামুল কবীর সুজনের এবং গীতিকার গোলাম মোরশেদের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বলে জানালেন মেসবাহ আহমেদ।

গজলের বিশাল পরিসরের মধ্যে থেকেও গত এক বছরে নতুন চারটা গান করেছেন ধ্রুপদীধারা এই শিল্পী। যার মধ্যে গানবাংলার তাপসের অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি ‘তিনি চাইলেই বাগানে বসন্ত আসে’ আর ‘বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে’ গান দুটো এরই মধ্যেই সমাদৃত হয়েছে। এসব গানের অডিও ভার্সনের কাজ চলছে, শিগগিরই তা রিলিজ পাবো বলে জানালেন মেসবাহ আহমেদ।