রোমে হয়নি, গ্লাসগোতে হবে কি জলবায়ু সমঝোতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক;
  • প্রকাশিত: ১ নভেম্বর ২০২১, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১ মাস আগে

ছবি: বিবিসি

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় শুরু হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন, যা আগামী ১২ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, এর আগে জি-২০ সম্মেলনে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়নি।

গ্লাসগোয় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সম্মেলন কপ-২৬ এ যোগ দিয়েছেন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা। সম্মেলনে যোগ দিতে রোববার গ্লাসগোতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। আজ তিনি ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে রোমে আলোচনায় বসেছিলেন জি-২০ দেশগুলোর নেতারা। পরিবেশ নিয়ে একাধিক বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি তারা। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি যে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে হবে, সে বিষয়ে একমত হয়েছেন সকলেই।

পুরো পৃথিবীতে বাতাসে যেভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ছে, তাতে এ শতাব্দীতে পৃথিবীর তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে হবে।

এর আগে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনেও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে ধরে রাখার ব্যবস্থা হবে বলে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

গ্লাসগোয় রোববার শুরু হয় জলবায়ু সম্মেলন। সেখানে আবার পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় বসবেন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা। আশা করা হচ্ছে, এ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

রোমের জি-২০ সম্মেলন নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। কবের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে কোনো লক্ষ্যমাত্রাই স্থির করা যায়নি জি-২০ সম্মেলনে। কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কী কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, কীভাবে তা করা সম্ভব- এ বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ছবি: বিবিসি

এখনো বহু দেশ কয়লার উপর নির্ভরশীল। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উপরেই বহু দেশের শিল্প নির্ভর করে। কীভাবে এ কয়লার ব্যবহার বন্ধ করা যায়, কত দ্রুত বিকল্প শক্তির কথা ভাবা যায়, তা নিয়েও এদিন কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে প্রতিটি দেশই জানিয়েছে, ক্রমশ কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনা দরকার।

সম্মেলনে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘খানিকটা হতাশ হয়েই রোম ছাড়ছি। জি-২০ বৈঠক হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না। আশা করব, গ্লাসগোর বৈঠকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।’ ইতালির প্রধানমন্ত্রীও সাংবাদিক সম্মেলনে নিজের হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অবশ্য হতাশ নন। তাদের বক্তব্য, প্যারিস জলবায়ু বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তা বহাল রাখার কথা এবারও সবাই বলেছেন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি যে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখতে হবে, সে বিষয়ে সব দেশই সহমত। কীভাবে তা করতে হবে, আগামী বৈঠকে তা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে বলেই তারা মনে করছেন।

সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারার মূল কারণ হলো উন্নত দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব। গ্লাসগোয় জলবায়ু পরিবর্তনের বৈঠকে ভারতের অন্যতম প্রতিনিধি মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। প্রথম দিনই তিনি ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

পীযূষের বক্তব্য, উন্নত দেশগুলো কয়লা ব্যবহার করে তার সুবিধা ভোগ করে ফেলেছে। এবার তারা কয়লার ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করুক। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও কিছুদিন কয়লা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হোক। কার্বন নিঃসরণ হলেও তাদের আরও কিছুদিন শিল্পোন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হোক।

প্যারিস জয়বায়ু সম্মেলনেও এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। সবার কথা মাথায় রেখে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়েছিল। তার মধ্যে কার্বন নিঃসরণ অনেকটা কমিয়ে ফেলার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। গ্লাসগো এ বিষয়ে নতুন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সে দিকেই তাকিয়ে আছেন পরিবেশবিদরা।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে শেষ সুযোগ: এবারের জাতিসংঘের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের সভাপতি, ব্রিটিশ মন্ত্রী অলোক শর্মা বলেছেন, এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে বা তার নীচে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে এখনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘ছয় বছর আগে প্যারিসে আমরা একটি যৌথ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলাম। তিনি বলেন, ‘১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নামিয়ে আনতে হলে কপ-২৬ হচ্ছে শেষ সুযোগ।’

তিনি হুঁশিয়ারি করে বলেন, এই পরিকল্পনা যদি সফল না হয় তাহলে উষ্ণ তাপমাত্রায় পুরো পৃথিবী যেমন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তেমনি সমুদ্র সীমা বেড়ে অনেক দেশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের তাপমাত্রা যে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্ব নেতাদের এবারের জলবায়ু সম্মেলনে নানান প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।

৩১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত এ সম্মেলন চলবে। সম্মেলনে দু’শর বেশি দেশের কাছে জানতে চাওয়া হবে, কীভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে তারা কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে আনতে চান। এ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

২০১৫ সালের সম্মেলনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নামিয়ে আনার ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন বিশ্ব নেতারা। সেই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, এখন সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে ক্ষতির শিকার হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ।

এর আগে ইতালির রোমে জি টুয়েন্টি শীর্ষ সম্মেলনে চূড়ান্ত আলোচনার আগে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী মারিও ড্রাঘি বলেছিলেন, বিশ্ব নেতাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে। না হলে পরে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে।

তিনি একে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সিংহাসনের ব্রিটিশ উত্তরাধিকারী, প্রিন্স চার্লস এ সম্মেলনকে ‘শেষ ও চূড়ান্ত সুযোগ’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এ সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তিনি। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে দুই সপ্তাহের এই সম্মেলনে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।

সম্মেলন থেকে প্রায় ২০০-এর বেশি দেশকে অনুরোধ করা হবে যেন তারা কার্বন নিঃসরণে আরও উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন।

এবারের সম্মেলনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করা, যতটা সম্ভব কম গাছ কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে যত বেশি সম্ভব মানুষকে রক্ষার বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানোর লক্ষ্য পূরণের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দরিদ্র দেশগুলো।

তাদের একটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করার জন্য দরিদ্র দেশগুলোকে গ্রিন টেকনোলজি বা পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি করেছিল ধনী দেশগুলো। কিন্তু এ জন্য যে অর্থ প্রয়োজন ছিল, এই ধনী দেশগুলো তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...