মীমাংসিত ইস্যু নিয়ে বিতর্ক কেনো, বিশেষজ্ঞদের বিস্ময়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক;
  • প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৪ সপ্তাহ আগে
প্রতীকী ছবি

তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, ভারসাম্যহীন বাণিজ্য এবং সীমান্ত হত্যাসহ নানা অমীমাংসিত সমস্যা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়ে গেছে। তার উপরে মহীসোপানের একাংশ দাবি নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে আনছে, মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করছে কেনো ভারত?

গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে ভারতের কিছু দাবির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে জাতিসংঘকে চিঠি দেয়া হয়। এর আগে গত ১৩ এপ্রিল এ বিষয়ে জাতিসংঘকে নিজেদের আপত্তির বিষয়টি জানিয়েছিল ভারত।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত যে রেখা টেনেছে সেখানে বাংলাদেশের কিছু অংশ তারা নিজেদের সীমায় দেখিয়েছে। এ বিরোধের উৎপত্তি ২০০৯ সালে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ নিজের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ বিষয়ক কমিশনে পাঠায়।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নির্ধারণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে জয়লাভ করে। রায় ভারতের বিপক্ষে যায়। বাংলাদেশ ২০২০ সালে আদালতের নির্দেশনা মেনে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সংশোধিত সমুদ্রসীমার মানচিত্র জমা দেয়।

শুক্রবার প্রকাশিত জার্মান সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে ভারত সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে মিটিয়ে ফেলার কথাও বলেছিল। বাংলাদেশ তাতে সায়ও দেয়। কিন্তু ভারত এখন একতরফাভাবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তাদের অধিকার দাবি করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সাথে ভারতের অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের সমস্যার সমাধানও হচ্ছে না। বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে কোনো চুক্তি এখন নেই। ১৯৯৬ সালে শুধুমাত্র গঙ্গা চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তিস্তাসহ আট নদীর পানিবণ্টনের কোনো চুক্তি নেই। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে অনেক পানি ঘোলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কে আরেকটি সংকটের জায়গা হলো সীমান্ত হত্যা। সীমান্তে হত্যার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং সীমান্তে কোনো প্রাণঘাতি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার বিষয়ে ভারতের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে অনেক দিন ধরেই। তারপরও সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা কমছে না। গত বছর সীমান্তে ৫২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

একইসঙ্গে ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন এবং নাগরিকপঞ্জি বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে। এসবের পাশাপাশি আছে ভারসাম্যহীন বাণিজ্য এবং অশুল্ক বাধা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এখন বাণিজ্য ঘাটতি চার হাজার ৬৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের অনেক অমীমাংসিত ইস্যু আছে। তারপরও ভারত কেন একটি মীমাংসিত ইস্যুকে আবার বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে তা আমি বুঝতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তারা কোন চিন্তায় এ কাজ করছে, তা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘সমুদ্রসীমা নিয়ে অমীমাংসিত ইস্যু আছে। কিন্তু মহীসোপানের যে অংশ তারা দাবি করছে, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এটা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।’

সাবেক এ পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘একটি নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়, তারা তাদের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত পাবে না জেনেও কেন বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে, সেটা ভেবে দেখার বিষয়।’

ভারতের এ নতুন দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদও বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের সাথে তার কোনো প্রতিবেশীরই সম্পর্ক ভালো না। সর্বশেষ নেপালের সাথেও তার সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। এটা দিয়ে ভারতের মানসিকতা বোঝা যায়।’

তিনি মনে করেন, ‘সম্পর্কের জায়গায় ভারত একটি বড় রাষ্ট্র হিসেবে উদারতা দেখাতে পারছে না। তাদের রাজনীতিবিদরা যা বলেন বাস্তবে তার প্রতিফলন কমই দেখা যায়। হতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হচ্ছে, তাই চাপে রাখতে চায়।’

তার মতে, ‘তারা যে এই বিষয়গুলো সব সময় বুঝেশুনে করেন, তা আমার কাছে মনে হয় না। তাই আমাদেরও তাদের ব্যাপারে ধারণার পরিবর্তন আনতে হবে।’

জার্মান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি দেশের প্রতি ঝুঁকে থাকার নীতি নয়। সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেই জায়গা থেকেই ভারত, চীনসহ সব দেশের সাথেই সুসম্পর্কবজায় রাখে বাংলাদেশ। তাতে প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের অভিমান বা রাগ করার কিছু নেই বলেও মনে করেন অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।

তার মতে, ‘অমীমাংসিত সমস্যা জিইয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সমস্যাও তৈরি করা কখনো কাম্য নয়। তিস্তাসহ আরও অনেক বিষয়ের সমাধান এখনো হয়নি। এতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।’

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...