ঢাকা ১২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কুমার নদের পাড় থেকে বুড়িগঙ্গা

নাজমুল হাসান রাজ
  • আপডেট : ০১:০৮:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২
  • / 79

কুমার নদের পাড়ে বসে দুই বন্ধু রাজ্যের গল্প শুরু করলাম। কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে টের পাইনি। গল্প চলছে সেই সাথে হাসি । আকাশ তখনও মেঘাচ্ছন্ন। হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে সকালে। থেমেছে দুপুরের আগেই। রাজ্যের সব পরিকল্পনা দুজনের মাথায়।

বোঝাপড়া কমতি নেই কোন বিষয়ে। ভবিষ্যত পরিকল্পনায় ছাড়াবো কুমার নদের পাড়। বুড়িগঙ্গার পাড় নিয়ে নতুন ভাবনা। নানা রকমের ভাবনা, কতটা সহজও স্বল্প সময়ে উন্নতি করা সম্ভব। যে কথা সেই কাজ। দুজনে একসঙ্গে আসতে না পারার দুঃখ প্রথম থেকেই।

যে মানুষটির এতাসব পরিকল্পনা সে ছাড়তে চায়নি কুমার নদের কচুরিপানায় ঘেরা শহরটি। এ যাত্রায় একাই পাড়ি দিয়েছি কুমার নদ, আড়িয়াল খা আর প্রমত্ত পদ্মার ঢেউ। একা থাকা নিয়ে প্রথম দিকে পাগল পাগল লাগতো। ছেড়ে আসতে হয়েছে কতো আপনজন আর আত্মার সাথে লেপ্টে থাকা ভালোবাসার প্রেয়সী (যদিও সে আমার হয়নি কখনো) এটা ভাবতে সব সময় চোখের কোণে পানি জমে থাকতো প্রায়ই। ফেলে আসা প্রতিটি পছন্দের যায়গাগুলো প্রতিনিয়ত স্বপ্নে দেখেছি। ঘুমের ঘরে কতোদিন উঠেছি জেগে তার ইয়ত্তা নেই।

যে গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা সেই গ্রামের দক্ষিণ পাড়া মাঠ থেকে শুরু করে মরাগাংনি রাস্তা কালভার্ট বড়পুল আর বান্ধাবাড়ি পার করে জাহাদ মিয়ার সুন্দরবন কাউন্টারের পেছনের অংশে দুধ চায়ের দোকান। কমলাপুরেই বেশ কয়েক যায়গা দুজনের ভীষণ প্রিয়। তার মধ্যে খোকন দাসের বাগান দিয়ে কুমারের এক ঘাটে গোসল করা। এস, জে স্কুলের সামনে কৃষ্ণচুড়াতলা। আব্দুললাদের বাড়ির ঘাট পেরিয়ে ইদ্রিস মোললার বাড়ি পেরিয়ে হাসপাতালের রাস্তা যা আমাদের নিত্যদিনের কাজ ।

সে সময়টা নতুন শহরে পাড়ি দেবার আগেই ঘটেছে এমন নয়। এস,জে স্কুলের ছাত্র থাকাকালীণ সমেয় প্রতিটি রা¯তা চেনা থাকায় সহজ হতো দুজনের বোঝাপড়া। দুজনের ঝগড়া হয়েছে মান অভিমান হয়েছে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে খালাম্মার পাঠিয়ে দেয়া টিফিন ক্যারিয়ারে মোটা চাউলের লাল ভাত মাছ খাওয়া নিয়ে কোনো বাধা ছিলো না। সময় গড়িয়ে জীবনের পথ বদলেছে।

যুক্ত হয়েছে নতুন মানষু বন্ধুত্বও। জীবনে অনেকেই আসে আবার চলেও যায়। স্মৃতি হাতড়ে ফিরে সেই কুমার নদের পাড়, এস,জে স্কুল, পরি কাকার দোকানের পুরি, গোবিন্দ দাদুর শক্ত সন্দেস, দয়াল বাবার দোকানের খাসির রেজালা। অন্বেষা সিনেমার তিন তলায় মুরুব্বিদের ক্যারম শেষ হওয়ার অপেক্ষা। প্রভাস ময়রার মিষ্টি খেয়ে ভ্যানে করে কেজি স্কুলের রেইনট্রি তলা, জয়া সিনেমার ভাংগা গুদাম ঘর। কেজি স্কুলের শক্ত ক্রিকেট ব্যাটের লাল টেপ টেনিস ও কলেজের পেছনে লম্বু স্যারের বাসায় থাকা সাদা পরী মেয়েটি।

সবই মেলে শুধু সেরকম আবেগময় ভালোবাসা খুজে পাইনা। এখন পরিকল্পনা হয় না। অনেক কিছু ভুলতে বসেছি। সেই বন্ধুত্বটাও আর হয় না । বুড়িগঙ্গার পাড়ে ইট পাথরের এই শহরের মানুষগুলো বড় বেমানান। কুমার নদের পাড়ের সেই পুরোনো গল্পে সময় কাটে নিজের সাথে বড় একাকী। আবারও সময় বের করে মন চায় ফিরে যেতে সেখানে। লুটোপুটি খাই বন্ধুত্বের বন্ধনে।

জীবনে পাড়ি দিয়েছি হাজারো কাটা বেছানো পথ। বন্ধুও ভুলে গিয়ে তার জীবন জর্জরিত করে কুমার নদের পাড় ছেড়ে ২০০ কিলো দুরে আবাস গেড়েছে। সেটা তার নিজের সিদ্ধান্তে।

দিন চলে যায় , সময় চলে তার আপন গতিতে। পাল্টায় জীবনের নানা মোড়। শৈশব ফেরৎ চায়নি এমন কোন মানুষ এ ভূবনে পাওয়া মুশকিল। অবশ্য আর কখনো আসেনা ফিরে আসেনা শৈশব। আপন মনে থাকা মানুষগুলো সব সময় ভালো থাকুক। স্মৃতির পাতায় মেলে ধরা সেসব স্থানগুলো হয়তো আর আগের মতো নেই । সে সময়ের পরিকল্পনায় ভুল ছিলো হয়তোবা।

সেসব যায়গাগুলো হয়তো নতুন কারো পরিকল্পনায় সেজেছে নতুন রঙে। দেহের সংসারী হতে বদলে যাওয়া প্রেয়সী যেমন ঘর করছে অন্য কারো। এমনই হয়তো কুমার নদের পাড় নতুন ঘাটে গোসল করছে অন্য কোনো পোশাকধারী। কুমারের পাড়ে কচুরিপানা পরিষ্কারে হয়তো নতুন কোনো পরিকল্পনা নিয়েছে সেখানকার প্রশাসন।অথবা কুষ্ণচুড়া গাছটির তলায় অন্য কেউ বসে নতুন ফুলে সাজাচ্ছে কারো জীবন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

কুমার নদের পাড় থেকে বুড়িগঙ্গা

আপডেট : ০১:০৮:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২

কুমার নদের পাড়ে বসে দুই বন্ধু রাজ্যের গল্প শুরু করলাম। কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে টের পাইনি। গল্প চলছে সেই সাথে হাসি । আকাশ তখনও মেঘাচ্ছন্ন। হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে সকালে। থেমেছে দুপুরের আগেই। রাজ্যের সব পরিকল্পনা দুজনের মাথায়।

বোঝাপড়া কমতি নেই কোন বিষয়ে। ভবিষ্যত পরিকল্পনায় ছাড়াবো কুমার নদের পাড়। বুড়িগঙ্গার পাড় নিয়ে নতুন ভাবনা। নানা রকমের ভাবনা, কতটা সহজও স্বল্প সময়ে উন্নতি করা সম্ভব। যে কথা সেই কাজ। দুজনে একসঙ্গে আসতে না পারার দুঃখ প্রথম থেকেই।

যে মানুষটির এতাসব পরিকল্পনা সে ছাড়তে চায়নি কুমার নদের কচুরিপানায় ঘেরা শহরটি। এ যাত্রায় একাই পাড়ি দিয়েছি কুমার নদ, আড়িয়াল খা আর প্রমত্ত পদ্মার ঢেউ। একা থাকা নিয়ে প্রথম দিকে পাগল পাগল লাগতো। ছেড়ে আসতে হয়েছে কতো আপনজন আর আত্মার সাথে লেপ্টে থাকা ভালোবাসার প্রেয়সী (যদিও সে আমার হয়নি কখনো) এটা ভাবতে সব সময় চোখের কোণে পানি জমে থাকতো প্রায়ই। ফেলে আসা প্রতিটি পছন্দের যায়গাগুলো প্রতিনিয়ত স্বপ্নে দেখেছি। ঘুমের ঘরে কতোদিন উঠেছি জেগে তার ইয়ত্তা নেই।

যে গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা সেই গ্রামের দক্ষিণ পাড়া মাঠ থেকে শুরু করে মরাগাংনি রাস্তা কালভার্ট বড়পুল আর বান্ধাবাড়ি পার করে জাহাদ মিয়ার সুন্দরবন কাউন্টারের পেছনের অংশে দুধ চায়ের দোকান। কমলাপুরেই বেশ কয়েক যায়গা দুজনের ভীষণ প্রিয়। তার মধ্যে খোকন দাসের বাগান দিয়ে কুমারের এক ঘাটে গোসল করা। এস, জে স্কুলের সামনে কৃষ্ণচুড়াতলা। আব্দুললাদের বাড়ির ঘাট পেরিয়ে ইদ্রিস মোললার বাড়ি পেরিয়ে হাসপাতালের রাস্তা যা আমাদের নিত্যদিনের কাজ ।

সে সময়টা নতুন শহরে পাড়ি দেবার আগেই ঘটেছে এমন নয়। এস,জে স্কুলের ছাত্র থাকাকালীণ সমেয় প্রতিটি রা¯তা চেনা থাকায় সহজ হতো দুজনের বোঝাপড়া। দুজনের ঝগড়া হয়েছে মান অভিমান হয়েছে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে খালাম্মার পাঠিয়ে দেয়া টিফিন ক্যারিয়ারে মোটা চাউলের লাল ভাত মাছ খাওয়া নিয়ে কোনো বাধা ছিলো না। সময় গড়িয়ে জীবনের পথ বদলেছে।

যুক্ত হয়েছে নতুন মানষু বন্ধুত্বও। জীবনে অনেকেই আসে আবার চলেও যায়। স্মৃতি হাতড়ে ফিরে সেই কুমার নদের পাড়, এস,জে স্কুল, পরি কাকার দোকানের পুরি, গোবিন্দ দাদুর শক্ত সন্দেস, দয়াল বাবার দোকানের খাসির রেজালা। অন্বেষা সিনেমার তিন তলায় মুরুব্বিদের ক্যারম শেষ হওয়ার অপেক্ষা। প্রভাস ময়রার মিষ্টি খেয়ে ভ্যানে করে কেজি স্কুলের রেইনট্রি তলা, জয়া সিনেমার ভাংগা গুদাম ঘর। কেজি স্কুলের শক্ত ক্রিকেট ব্যাটের লাল টেপ টেনিস ও কলেজের পেছনে লম্বু স্যারের বাসায় থাকা সাদা পরী মেয়েটি।

সবই মেলে শুধু সেরকম আবেগময় ভালোবাসা খুজে পাইনা। এখন পরিকল্পনা হয় না। অনেক কিছু ভুলতে বসেছি। সেই বন্ধুত্বটাও আর হয় না । বুড়িগঙ্গার পাড়ে ইট পাথরের এই শহরের মানুষগুলো বড় বেমানান। কুমার নদের পাড়ের সেই পুরোনো গল্পে সময় কাটে নিজের সাথে বড় একাকী। আবারও সময় বের করে মন চায় ফিরে যেতে সেখানে। লুটোপুটি খাই বন্ধুত্বের বন্ধনে।

জীবনে পাড়ি দিয়েছি হাজারো কাটা বেছানো পথ। বন্ধুও ভুলে গিয়ে তার জীবন জর্জরিত করে কুমার নদের পাড় ছেড়ে ২০০ কিলো দুরে আবাস গেড়েছে। সেটা তার নিজের সিদ্ধান্তে।

দিন চলে যায় , সময় চলে তার আপন গতিতে। পাল্টায় জীবনের নানা মোড়। শৈশব ফেরৎ চায়নি এমন কোন মানুষ এ ভূবনে পাওয়া মুশকিল। অবশ্য আর কখনো আসেনা ফিরে আসেনা শৈশব। আপন মনে থাকা মানুষগুলো সব সময় ভালো থাকুক। স্মৃতির পাতায় মেলে ধরা সেসব স্থানগুলো হয়তো আর আগের মতো নেই । সে সময়ের পরিকল্পনায় ভুল ছিলো হয়তোবা।

সেসব যায়গাগুলো হয়তো নতুন কারো পরিকল্পনায় সেজেছে নতুন রঙে। দেহের সংসারী হতে বদলে যাওয়া প্রেয়সী যেমন ঘর করছে অন্য কারো। এমনই হয়তো কুমার নদের পাড় নতুন ঘাটে গোসল করছে অন্য কোনো পোশাকধারী। কুমারের পাড়ে কচুরিপানা পরিষ্কারে হয়তো নতুন কোনো পরিকল্পনা নিয়েছে সেখানকার প্রশাসন।অথবা কুষ্ণচুড়া গাছটির তলায় অন্য কেউ বসে নতুন ফুলে সাজাচ্ছে কারো জীবন।