রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিণী ইউনিয়নের জয়রাম গ্রামে মিজানুর রহমান পাইলটকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, জমি দখল থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, দাদন ব্যবসা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন—বিভিন্ন অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন তিনি। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকায় এমন একটি প্রভাব তৈরি করা হয়েছে, যার কারণে অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে চান না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মিজানুর রহমান পাইলট দাদন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রয়োজনের সময় সুদের ভিত্তিতে টাকা দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে টাকা ও সুদের অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে দেনাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, টাকা আদায়ের জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি কথিত পালিত সন্তাশবাহিনী ব্যবহার করে। এমনকি দেনাদারদের তুলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এবং নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। শুধু দাদন ব্যবসা নয়, মিজানুর রহমান পাইলটের বিরুদ্ধে জমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির জমি নিয়ে বিরোধের সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে জমি দখল করে দেওয়া সহ বিশেষ করে দুর্বল ও অসহায় মানুষদের জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ভয়ভীতি কিংবা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কন্টার্ক নিয়ে মারামারি, জমি দখল তার নিত্য দিনে কর্মকান্ড। এ ভাবে তিনি তৈরী করেছেন নিজের অবৈধ সম্পদের পাহাড়। চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের মুখে। তাদের দাবি, প্রভাব ও ভয়ভীতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন তিনি। তার সন্তাসী বাহীনির ভয়ে কেউ থানায় কিংবা আদলে তার বিরুদ্ধে মামলা করার তো দূরের কথা চিন্তাও করতে পারেন না কেউ বলে অভিডযোগ করেন নাম প্রকাশে এক যুবক।
সেই যুবক আরো বলেন, তিনি কিশোর গাং,মাদক সহ কেচিনোর সেলডার দ্বারা। তার নিয়ন্ত্রেই রয়েছে প্রায় চারটি কিশোর গাং এবং এই কিশোর গাং দিয়েই তিনি নিয়ন্ত্রন করেন মাদক, কেচিনো,থাই জুয়া,অনলাইন জুয়া সহ সকল সন্তাসী কর্মকান্ড।
স্থানীয় সূত্রের জানা যায়, মিজানুর রহমান পাইলট নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সদ্যপুস্করিণী ইউনিয়ন শাখার সদস্য এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন। ২০২১ সালের তার নিজের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে পুনোরায় মনোয়ন দাখিল করেন। তার সন্তাসী বাহীনি দ্বারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সভাপতি নির্বাচনের পায়তায় নির্বাচনের দিন সন্তাসী কর্মকান্ড চালায়। সেই নির্বাচনি কর্মকান্ডের কারণে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব থাকা নেতা কর্মিরা নির্বাচন স্থগিত ঘোষনা করে পুলিশের সহযোগীয় এবং পুলিশ পটোকলে স্থান ত্যাগ করে নিরাপদে চলে যান।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে তিনি এলাকায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মিজানুর রহমান পাইলটকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ তার স্ত্রী রূপালী বেগমের হত্যাকাণ্ড।
পরিবারের দাবি, ২০১২ সালে রূপালী বেগমকে জবাই করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে রুপালি বেগমের বড় ভাই মনোয়ার হোসেন রংপুর কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর পর দির্ঘ্য ৮ বছর এই মামলা স্বাক্ষী প্ররমাণের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। পরিবারের আরও দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে কারাগারের বাইরে আসেন।
রূপালী বেগমের পরিবারের অভিযোগ, তারা আর্থিক ও সামাজিকভাবে অসহায় হওয়ায় প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারেননি। পরিবারের দাবি, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা মেয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার অনুভূতি পাচ্ছেন না।
রূপালী বেগমের মা মনোয়ারা বেগম মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি বলেন, “আমার মেয়ে হত্যার বিচার আজও পাইনি। ক্ষমতার কাছে আমরা হেরে গেছি।” মায়ের এই অভিযোগে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বেদনার চিত্র ফুটে ওঠে। তার দাবি, মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত বিচার ও মামলার বর্তমান অবস্থার বিষয়ে তারা স্পষ্ট তথ্য চান।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, মিজানুর রহমানেরর বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, দাদন ব্যবসা, ভয়ভীতি ও নির্যাতনের মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে , এর পরেও এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনিরর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
একই সঙ্গে রূপালী বেগমের হত্যা মামলার বর্তমান আইনি অবস্থাও পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বিষয়টি বাদ দিয়ে আদালতের নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা জনগণের সামনে তুলে ধরা হোক বলে দাবী সচেতন মহলের।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মিজানুর রহমান পাইলটে বক্তব্য চানতে চাইলে তিনি এই বিষয়ে কোন কথা বলতে যান বলে জানান
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের কোনোটি সত্য না হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তাদের মতে, একজন ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, জমি, অর্থ, ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা বিচার—কোনো ক্ষেত্রেই আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আর অন্য দিকে রূপালী বেগমের পরিবারের অপেক্ষা এখন একটাই—মেয়ের মৃত্যুর মামলার প্রকৃত আইনি অবস্থান কী এবং তারা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাবেন কি না।
