ঢাকা ১২:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সিপাহী-জনতার অভ্যূাত্থন দিবস পালন করলো জাসদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট : ০৭:৫৪:৫৮ অপরাহ্ন, সোমাবার, ৭ নভেম্বর ২০২২
  • / 88

ক্ষমতালিপ্সু উচ্চাভিলাসী সামরিক অফিসারদের দ্বারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার, অবৈধ ক্ষমতা দখল ও সংবিধান লংঘন, বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা হত্যাসহ হত্যা-ক্যু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোর অবসানের লক্ষ্যে সংগঠিত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থান স্মরণে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ঢাকা মহানগর কমিটির উদ্যোগে সোমবার (৭ নভেম্বর) বিকালে শহীদ কর্নেল তাহের মিলনায়তনে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক, মহান দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার, মহান বিপ্লবী জাসদ নেতা শহীদ কর্নেল তাহের বীরউত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা মহানগর জাসদের সমন্বয়ক মীর হোসাইন আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জাসদ স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শহীদ কর্নেল তাহের বীর উত্তম এর অনুজ অধ্যাপক ড. মু. আনোয়ার হোসেন, সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান বাবুল, বীরমুক্তিযোদ্ধা শফি উদ্দিন মোল্লা, উম্মে হাসান ঝলমল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাদের চৌধুরী, অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান মুক্তাদির, শওকত রায়হান, রোকনুজ্জামান রোকন, নইমুল আহসান জুয়েল, মীর্জা মো. আনোয়ারুল হক, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ এর সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা সাইফুজ্জামান বাদশা, জাতীয় কৃষক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নুরুল আমিন কাউছার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (ন-মা) কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাশিদুল হক ননী প্রমূখ। দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি বিদেশে অবস্থান করায় এবং সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি অসুস্থ থাকায় তাদের প্রেরিত লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শোনানো হয়।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি তার লিখিত বক্তব্যে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভাসহ শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি মহান বিপ্লবী, মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের মৃত্যুঞ্জয়ী কমান্ডার, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহ, সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক, রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের শিকার শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

হাসানুল হক ইনু বলেন, ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশী-বিদেশী শক্তি তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে সশস্ত্রবাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর উচ্চাভিলাষী সামরিক অফিসাররা নিজের হাতে ক্ষমতা নেয়ার জন্য পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার জন্য পাগলা কুকুরের মত উন্মত্ত প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলে।

এরকম পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর তৎকালীন সিজিএস খালেদ মোশাররফ তার অনুগত কায়েকজন অফিসারকে নিয়ে ৩ নভেম্বর পাল্টা ক্যু করে সেনাপ্রধান জিয়াকে গৃহবন্দী করে নিজেকে সেনাপ্রধান এবং সামরিক আইন জারি করে। সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে ক্ষমতার জন্য কামড়াকামড়ির ঘটনায় সিপাহীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। সিপাহীরা সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেয়। সিপাহীরা সেনাবাহিনীতে জনপ্রিয় সাবেক সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কামান্ডার কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের নিদেশনা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন। কর্নেল তাহের জাসদের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি জাসদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি সিওসির সদস্যদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। জাসদের সিদ্ধান্তে তিনি সিপাহীদের বিদ্রোহকে শৃংখলার মধ্যে রাখা, রক্তপাত এড়ানোর জন্য জাসদ নেতৃত্বকে সাথে নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপ করেন। সিপাহী বিদ্রোহ সফল হয়। জিয়া মুক্ত হয়।

তিনি বলেন, কর্নেল তাহের বা জাসদ ক্ষমতা দখল করার জন্য সিপাহীদের বিদ্রোহে যুক্ত হয়নি। কর্নেল তাহের, জাসদ চেয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে যে হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্র, সংবিধান লংঘণ-অবৈধ ক্ষমতা দখল-সামরিক শাসনের ধারা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, সশস্ত্র বাহিনীতে যে বিশৃংখলা তৈরি হয়েছিলÑ সেই ধারার অবসান করা। উপনিবেশিক আমলের সেনা কাঠামো, রাষ্ট্র প্রশাসন কাঠামোর পরিবর্তন করে স্বাধীন দেশের উপযোগী রাষ্ট্র-প্রশাসন কাঠামো, সেনা কাঠামো গড়ে তোলা। তাই জাসদ বা কর্নেল তাহের নিজের হাতে ক্ষমতা না নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

কর্নেল তাহের ও সিপাহীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জিয়াকে মুক্ত করেছিল। জিয়া মুক্ত হয়েই সিপাহীদের দাবি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের পথে না গিয়ে নিজে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বিদ্রোহী সিপাহী ও কর্নেল তাহেরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কর্নেল তাহেরসহ শত শত অফিসার, সৈনিককে হত্যা করে। জাসদের নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ করে। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় কর্নেল তাহের মহানয়ক, জিয়া খলনায়ক।

তিনি বলেন, জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতায় সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও হত্যা-খুন-ষড়যন্ত্র-ক্যু-সংবিধান লংঘণ-অবৈধ ক্ষমতা দখল-সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সিপাহীদের বিদ্রোহ বিশ্বের রাজনীতির ইতিাসে এক অনন্য মহান ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু যেমন খন্দকার মুশতাককে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন, কর্নেল তাহেরও জিয়াকে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন।

হাসানুল হক ইনু বলেন, আজ এটা প্রমাণিত হয়েছে ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহ ছিল সামরিক অফিসারদের উশংখলার বিপরীতে সিপাহীদের শৃংখলা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ঘটনা। বিশ্বের দেশে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা মানেই রক্তপাত ও নির্মমতার ঘটনা। ২০০৯ সালের বিডিআর এর সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা কতটা নির্মম ছিল তা সবাই জানেন। ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহে সিপাহীরা আকাশের দিকে লক্ষ লক্ষ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। তাদের হাতে অস্ত্র-গোলা-বারুদ সবই ছিলো। কিন্তু দুএকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অফিসার বা সিপাহী বা মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনা, রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। খালেদ মোশাররফ, হায়দার, হুদাকে কোনো সিপাহী হত্যা করেনি। এই তিনজন অফিসারকে কোন অফিসাররা কার নির্দেশে হত্যা করেছে তা আজ প্রকাশিত।

তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় আজও দেশের অসাংবিধানিক শাসন, অসাংবিধানিক সরকার, মোশতাক-জিয়ার চাপিয়ে দেয়া পাকিস্তানপন্থার সরকার আনার অপরাজনীতি চলছে। জনাব ইনু সিপাহী বিদ্রোহের চেতনা ও কর্নেল তাহেরের শিক্ষাকে ধারণ করে অসাংবিধানিক শাসন, অসাংবিধানিক সরকার, পাকিস্তানপন্থার সরকার আনার অপরাজনীতি রুখে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রামে অবিচল থাকার জন্য জাসদের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি তার লিখিত বক্তব্যে শারীরিক অসুস্থতার কারণে এ কর্মসূচিতে যোগদান করতে পারছেন না বলে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক মহান বিপ্লবী শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কর্নেল তাহেরের চেতনার ভিত্তি ছিল দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, জনগণের শোষণ মুক্তি, সমাজ বিপ্লব, শোষণ ও বৈষম্য মুক্ত সমাজ এবং সমাজতন্ত্র। তিনি কর্নেল তাহেরের চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, সমজতন্ত্রের বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম এগিয়ে নিতে জাসদের বদ্ধ পরিকর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

অধ্যাপক ড. মু. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর থেকে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি রাষ্ট্রর অভ্যন্তরে এবং বাইরে ষড়যন্ত্র করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে জাতীয় চার নেতা, কর্নেল তাহেরসহ হাজার হাজার দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মীকে।


তিনি বলেন, দুই যুগের বেশী সময় ধরে এরা বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করে রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে এদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। তাদের সেই সড়যন্ত্র এখনও অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামাত ও ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি মাঠে নেমেছে। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী রাজনৈতিক শক্তির একটি শক্তিশালী, কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্যই কেবল ষড়যন্ত্রকারীদের সকল চক্রান্তকে ব্যর্থ করে পুনরায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সরকার কায়েম করতে পারে। একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এবং তার অগ্রযাত্রার জন্য এমন ঐক্যই জরুরি। শহীদ কর্নেল তাহের বীর উত্তমের চেতনা ও শিক্ষাই ছিল বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া।

আলোচনা সভার পূর্বে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির নেতৃবৃন্দ, কর্নেল তাহেরের পরিবারের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. মু. আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদ, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ, জাতীয় কৃষক জোট, জাতীয় নারী জোট, জাতীয় যুব জোট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (ন-মা)সহ অন্যান্য সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

সিপাহী-জনতার অভ্যূাত্থন দিবস পালন করলো জাসদ

আপডেট : ০৭:৫৪:৫৮ অপরাহ্ন, সোমাবার, ৭ নভেম্বর ২০২২

ক্ষমতালিপ্সু উচ্চাভিলাসী সামরিক অফিসারদের দ্বারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার, অবৈধ ক্ষমতা দখল ও সংবিধান লংঘন, বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা হত্যাসহ হত্যা-ক্যু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোর অবসানের লক্ষ্যে সংগঠিত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থান স্মরণে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ঢাকা মহানগর কমিটির উদ্যোগে সোমবার (৭ নভেম্বর) বিকালে শহীদ কর্নেল তাহের মিলনায়তনে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক, মহান দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার, মহান বিপ্লবী জাসদ নেতা শহীদ কর্নেল তাহের বীরউত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা মহানগর জাসদের সমন্বয়ক মীর হোসাইন আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জাসদ স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শহীদ কর্নেল তাহের বীর উত্তম এর অনুজ অধ্যাপক ড. মু. আনোয়ার হোসেন, সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান বাবুল, বীরমুক্তিযোদ্ধা শফি উদ্দিন মোল্লা, উম্মে হাসান ঝলমল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাদের চৌধুরী, অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান মুক্তাদির, শওকত রায়হান, রোকনুজ্জামান রোকন, নইমুল আহসান জুয়েল, মীর্জা মো. আনোয়ারুল হক, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ এর সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা সাইফুজ্জামান বাদশা, জাতীয় কৃষক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নুরুল আমিন কাউছার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (ন-মা) কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাশিদুল হক ননী প্রমূখ। দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি বিদেশে অবস্থান করায় এবং সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি অসুস্থ থাকায় তাদের প্রেরিত লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শোনানো হয়।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি তার লিখিত বক্তব্যে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভাসহ শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি মহান বিপ্লবী, মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের মৃত্যুঞ্জয়ী কমান্ডার, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহ, সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক, রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের শিকার শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

হাসানুল হক ইনু বলেন, ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশী-বিদেশী শক্তি তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে সশস্ত্রবাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর উচ্চাভিলাষী সামরিক অফিসাররা নিজের হাতে ক্ষমতা নেয়ার জন্য পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার জন্য পাগলা কুকুরের মত উন্মত্ত প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলে।

এরকম পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর তৎকালীন সিজিএস খালেদ মোশাররফ তার অনুগত কায়েকজন অফিসারকে নিয়ে ৩ নভেম্বর পাল্টা ক্যু করে সেনাপ্রধান জিয়াকে গৃহবন্দী করে নিজেকে সেনাপ্রধান এবং সামরিক আইন জারি করে। সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে ক্ষমতার জন্য কামড়াকামড়ির ঘটনায় সিপাহীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। সিপাহীরা সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেয়। সিপাহীরা সেনাবাহিনীতে জনপ্রিয় সাবেক সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কামান্ডার কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের নিদেশনা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন। কর্নেল তাহের জাসদের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি জাসদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি সিওসির সদস্যদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। জাসদের সিদ্ধান্তে তিনি সিপাহীদের বিদ্রোহকে শৃংখলার মধ্যে রাখা, রক্তপাত এড়ানোর জন্য জাসদ নেতৃত্বকে সাথে নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপ করেন। সিপাহী বিদ্রোহ সফল হয়। জিয়া মুক্ত হয়।

তিনি বলেন, কর্নেল তাহের বা জাসদ ক্ষমতা দখল করার জন্য সিপাহীদের বিদ্রোহে যুক্ত হয়নি। কর্নেল তাহের, জাসদ চেয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে যে হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্র, সংবিধান লংঘণ-অবৈধ ক্ষমতা দখল-সামরিক শাসনের ধারা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, সশস্ত্র বাহিনীতে যে বিশৃংখলা তৈরি হয়েছিলÑ সেই ধারার অবসান করা। উপনিবেশিক আমলের সেনা কাঠামো, রাষ্ট্র প্রশাসন কাঠামোর পরিবর্তন করে স্বাধীন দেশের উপযোগী রাষ্ট্র-প্রশাসন কাঠামো, সেনা কাঠামো গড়ে তোলা। তাই জাসদ বা কর্নেল তাহের নিজের হাতে ক্ষমতা না নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

কর্নেল তাহের ও সিপাহীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জিয়াকে মুক্ত করেছিল। জিয়া মুক্ত হয়েই সিপাহীদের দাবি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের পথে না গিয়ে নিজে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বিদ্রোহী সিপাহী ও কর্নেল তাহেরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কর্নেল তাহেরসহ শত শত অফিসার, সৈনিককে হত্যা করে। জাসদের নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ করে। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় কর্নেল তাহের মহানয়ক, জিয়া খলনায়ক।

তিনি বলেন, জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতায় সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও হত্যা-খুন-ষড়যন্ত্র-ক্যু-সংবিধান লংঘণ-অবৈধ ক্ষমতা দখল-সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সিপাহীদের বিদ্রোহ বিশ্বের রাজনীতির ইতিাসে এক অনন্য মহান ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু যেমন খন্দকার মুশতাককে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন, কর্নেল তাহেরও জিয়াকে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন।

হাসানুল হক ইনু বলেন, আজ এটা প্রমাণিত হয়েছে ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহ ছিল সামরিক অফিসারদের উশংখলার বিপরীতে সিপাহীদের শৃংখলা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ঘটনা। বিশ্বের দেশে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা মানেই রক্তপাত ও নির্মমতার ঘটনা। ২০০৯ সালের বিডিআর এর সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা কতটা নির্মম ছিল তা সবাই জানেন। ৭ নভেম্বর সিপাহী বিদ্রোহে সিপাহীরা আকাশের দিকে লক্ষ লক্ষ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। তাদের হাতে অস্ত্র-গোলা-বারুদ সবই ছিলো। কিন্তু দুএকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অফিসার বা সিপাহী বা মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনা, রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। খালেদ মোশাররফ, হায়দার, হুদাকে কোনো সিপাহী হত্যা করেনি। এই তিনজন অফিসারকে কোন অফিসাররা কার নির্দেশে হত্যা করেছে তা আজ প্রকাশিত।

তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় আজও দেশের অসাংবিধানিক শাসন, অসাংবিধানিক সরকার, মোশতাক-জিয়ার চাপিয়ে দেয়া পাকিস্তানপন্থার সরকার আনার অপরাজনীতি চলছে। জনাব ইনু সিপাহী বিদ্রোহের চেতনা ও কর্নেল তাহেরের শিক্ষাকে ধারণ করে অসাংবিধানিক শাসন, অসাংবিধানিক সরকার, পাকিস্তানপন্থার সরকার আনার অপরাজনীতি রুখে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রামে অবিচল থাকার জন্য জাসদের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি তার লিখিত বক্তব্যে শারীরিক অসুস্থতার কারণে এ কর্মসূচিতে যোগদান করতে পারছেন না বলে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক মহান বিপ্লবী শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কর্নেল তাহেরের চেতনার ভিত্তি ছিল দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, জনগণের শোষণ মুক্তি, সমাজ বিপ্লব, শোষণ ও বৈষম্য মুক্ত সমাজ এবং সমাজতন্ত্র। তিনি কর্নেল তাহেরের চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, সমজতন্ত্রের বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম এগিয়ে নিতে জাসদের বদ্ধ পরিকর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

অধ্যাপক ড. মু. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর থেকে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি রাষ্ট্রর অভ্যন্তরে এবং বাইরে ষড়যন্ত্র করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে জাতীয় চার নেতা, কর্নেল তাহেরসহ হাজার হাজার দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মীকে।


তিনি বলেন, দুই যুগের বেশী সময় ধরে এরা বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করে রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে এদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। তাদের সেই সড়যন্ত্র এখনও অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামাত ও ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি মাঠে নেমেছে। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী রাজনৈতিক শক্তির একটি শক্তিশালী, কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্যই কেবল ষড়যন্ত্রকারীদের সকল চক্রান্তকে ব্যর্থ করে পুনরায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সরকার কায়েম করতে পারে। একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এবং তার অগ্রযাত্রার জন্য এমন ঐক্যই জরুরি। শহীদ কর্নেল তাহের বীর উত্তমের চেতনা ও শিক্ষাই ছিল বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া।

আলোচনা সভার পূর্বে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মহানায়ক শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির নেতৃবৃন্দ, কর্নেল তাহেরের পরিবারের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. মু. আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদ, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ, জাতীয় কৃষক জোট, জাতীয় নারী জোট, জাতীয় যুব জোট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (ন-মা)সহ অন্যান্য সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।