মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সত্যের মূল্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙার এখনই সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

“সত্য বলার জন্য সাংবাদিকদেরকে প্রতিনিয়ত এক ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে।”—জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের এই একটিমাত্র উচ্চারণই আজকের বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংবাদকর্মীদের চরম ঝুঁকির চিত্রটি স্পষ্ট করে তুলতে যথেষ্ট।

সোমবার ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়মুক্তির অবসান দিবস’-এ জাতিসংঘের শীর্ষ এই কর্মকর্তা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম পেশাজীবীদের সুরক্ষার যে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন, তা কেবল একটি দিবসীয় বাণীবদ্ধ আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার এক নিদারুণ প্রতিচ্ছবি।

গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন—এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই আধুনিক সভ্যতার সৌধ দণ্ডায়মান। আর এই স্তম্ভগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রধান অনুঘটক হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা। অথচ নির্মম সত্য হলো, যাঁরা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুকানো সত্য প্রকাশ করেন, তাঁরাই আজ সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। গুতেরেস যেমনটি উল্লেখ করেছেন, সাংবাদিকরা কেবল নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করার অপরাধেই প্রতিনিয়ত হয়রানি, বিচারবহির্ভূত নজরদারি, গায়েবি মামলা, শারীরিক আক্রমণ, কারাবাস—এমনকি নির্যাতন ও মর্মান্তিক হত্যার শিকার হচ্ছেন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বা বিবেক। কিন্তু যখন সেই বিবেকের টুঁটি চেপে ধরা হয়, তখন পুরো সমাজব্যবস্থাই অন্ধত্বের দিকে ধাবিত হয়। সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার অর্থ হলো জনস্বার্থের কণ্ঠরোধ করা। অপরাধীদের দায়মুক্তি যখন সংস্কৃতির রূপ নেয়, তখন তা অন্যায়কে আরও বেশি উৎসাহিত করে। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের সিংহভাগই বিচারবহির্ভূত থেকে যায়, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথকে সংকুচিত করছে এবং সমাজে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিক নিপীড়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মামলা, হামলা বা ভীতির পরিবেশ তৈরি করে সত্যকে কখনো চাপা দেওয়া যায় না; বরং তা সাময়িক বাধা সৃষ্টি করলেও সত্য তার নিজস্ব গতিতে ঠিকই প্রকাশিত হয়।

জাতিসংঘের মহাসচিবের এই সতর্কবার্তা কেবল সরকার বা নীতিনির্ধারকদের জন্যই নয়, বরং গোটা বিশ্ববাসীর জন্য একটি নৈতিক জাগরণের ডাক। সাংবাদিকদের কাজ করার ক্ষমতায় কোনো বাধাই সৃষ্টি করা যাবে না। একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও ভয়হীন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল একটি সুস্থ, জবাবদিহিমূলক এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। সময় এসেছে বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষায় কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের।